শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ২:৩৩ pm
আগে শহীদদের স্বীকৃতি, পরে যুদ্ধাপরাধী
বুধবার ১৪ অক্টোবর ২০১৫ , ২:২৪ pm
image001-576x378

এডভোকেট সিরাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক
ঢাকা: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সেনা সদস্যরা এদেশের ত্রিশ লাখ শহীদের জীবন ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে, সে স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অসহায় ও নিরপরাধ মানুষদেরকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা সম্পুর্ণ অন্যায় ও অবৈধ। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালো রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিহত সকল শহীদ বাঙ্গালী ও বুদ্ধিজীবিদেরকে  মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান না করা বেআইনি। আর তাদেরকে হত্যার দায়ে প্রকৃত দায়ী পাকিস্তানি সেনা সদস্যদেরকে বিনা বিচারে ক্ষমা করা অর্থ হচ্ছে পুরো জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং আসল অপরাধীদেরকে আড়াল করে ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নিরুপায়, নিরপরাধ ও অসহায় জনসাধারণকে অপরাধী সাব্যস্ত করা সম্পূর্ণরূপে বিচারবিভাগীয় মিথ্যাচারিতার শামিল। কারণ, এ সকল অসহায় জনসাধারণের একান্ত সহযোগীতার ফলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বাংলাদেশে বর্তমান তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাগণ এ সাধারণ জনতা ও লাখো শহীদের আত্মত্যাগ ছাড়া কখনো দেশকে স্বাধীন করতে পারতেন না। এজন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কখনো দুই লাখে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। ত্রিশ লাখ জীবনদানকারী শহীদগণ অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা। পাকবাহিনীর জুলুমের শিকার ও সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোনও এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ লাখ লাখ বাঙ্গালী যারা পাকিস্তানে অবরূদ্ধ ও বন্দি ছিলেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। লাখ লাখ শরণার্থী বাঙ্গালী যারা ভারতে গমন করে মানবেতর দিনাতিপাত করেছে, বিশ্ববিবেককে আকৃষ্ট করেছে তথা পৃথিবীর সমর্থন লাভের উপকরণ হয়েছে, তারাও প্রত্যেকে মুক্তিযোদ্ধা। সর্বোপরি, যে অসহায় বাঙ্গালী জনগোষ্ঠি পাকবাহিনীর থাবার মুখে দেশের মাটিতে অবস্থান করে নিরুপায় দিনাতিপাাত করেছে এবং গোয়েন্দা বাহিনীর ন্যায় গোপনে বা প্রকাশ্যে গেরিলা যুদ্ধে সহায়তা করেছে, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। এদের প্রত্যেককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে সর্বপ্রথম ত্রিশ লাখ শহীদদেরকে স্বাীকৃতি প্রদান করেছিলেন। তিনি মাত্র ৬৭৬ জন কৃতিযোদ্ধাদেরকে খেতাব প্রদান করে অবশিষ্ট সকল জনতাকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু লাখো জনতার সামনে যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন তাতে এ বিষয় সুস্পষ্ট হয়। উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে লাখ লাখ জনতার সামনে লাখো শহীদদেরকে বার বার স্মরণ করছিলেন এবং অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কন্ঠে বললেন- কবিগুরু, আপনি বলেছেন, সাত কোটি মানুষেরে হে বঙ্গ জননী, রেখেছ বাঙ্গালী করে মানুষ করনি। আপনি দেখুন,  আমার বাঙ্গালী আজ মানুষ হয়েছে, তারা দেশকে স্বাধীন করেছে। বঙ্গবন্ধু সেদিন স্পষ্ট ঘোষণা করেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। লাখো মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের স্বাদ পুর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার প্রতি জানাই সালাম। তোমরা আমার সালাম নাও। আমার বাংলায় আজ এক বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। এ স্বাধীনতা রক্ষার দ্বায়িত্বও  আপনাদেরই। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে। খেয়ে পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।”
বঙ্গবন্ধুর মুখশ্রিত উক্ত ত্রিশ লাখ শহীদদেরকে অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত। তারপর তাদের হত্যাকারীদেরকে শনাক্ত করে চুড়ান্ত বিচার করা উচিত। এজন্য অবশ্যই আগে পাকি হানাদারদের বিচার করা উচিত। তারা ২৫ শে মার্চে হাজার হাজার বাঙ্গালী শহীদ করেছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত রেখেছে। পরিশেষে তারা নিজেদের বেতনে পোষা বুদ্ধিজীবিদেরকে ১৪ই ডিসেম্বরে জঘন্যভাবে হত্যা করেছে। এ শহীদ বুদ্ধিজীবিরা তাদের সকল চেষ্টা ও কৌশল প্রয়োগ করে মূলত স্বাধীনতার জন্যই লড়াই করেছেন। প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানি সুবিধাভোগী হলেও এ শহীদেরা ছিলেন এক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এজন্য পাকিস্তানী বেতনভোগী এ শহীদদেরকে হত্যার দায়ে কোনো বাংলাদেশীকে অভিযুক্ত করার আগে অবশ্যই পাকি খুনিদেরকে অভিযুক্ত করা উচিত। তারাই সকল হত্যাকান্ডের মূল ঘাতক।  
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে চলছে সম্পুর্ণ উল্টো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নামে দেশে চলছে অবৈধ বিচার কার্য্যক্রম। পাকিস্তানী খুনিদেরকে আড়ালে রেখে এদেশের অসহায়, নিরপরাধ ও আত্মরক্ষায় বিশেষ কৌশল অবলম্বনকারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অন্যায়ভাবে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। তাদেরকে ঐতিহাসিক মিথ্যাচারিতার শিকারে ফেলা হচ্ছে। তথাকথিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাকে অবৈধভাবে সত্য ও সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে দেশপ্রেমের মহান চেতনা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে, তবু তা রক্ষার সংগ্রামে আর কেউ জীবন বিসর্জন করতে এগিয়ে আসবেনা।
তাই এখনই উচিত, ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি সংগ্রামী মানুষদেরকে অযথা মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পার্থক্য না করে বিচারবিভাগীয় হত্যাকান্ড দ্রæত বন্ধ করা। দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বাতিল করে ১৯৭১ এর ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনসহ তৎকালিন সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা। এবং বর্তমান সতের কোটি বাংলদেশী প্রত্যেককে উক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা।

 

প্রহরনিউজ/পাঠকের মতামত/তাজ/১৪ অক্টোবর, ২০১৫

 

এই লেখা পাঠকের সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত