শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ১২:৫০ am
শিশুর আশ্রম বনাম বৃদ্ধাশ্রম
বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০১৫ , ৯:৪৩ pm
Old-Age-Home-360x146

রাজু আহমেদ
ঢাকা: সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের সম্পর্কের সূচনা শিশুর অবুঝ বয়স থেকে। একটি মানবশিশু পৃথিবীতে আগমনের পর প্রথমে তার মাকে চেনে। মায়ের সাথেই শিশুর সর্বপ্রথম আত্মিক পরিচয় ঘটে। আত্মিক পরিচয়য়ের মাধ্যমেই সূচিত হয় আত্মিক সম্পর্কের; যে সম্পর্কের তুলনা পৃথিবীর অন্য কোন সম্পর্কের সাথে চলে না। এরপর মায়ের মাধ্যমে বাবার সাথে পরিচয় হয়। একজন মা যদি তার সন্তানকে পিতা হিসেবে একজন ভুল মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয় তবে কোন সন্তানের সাধ্য নাই সে ভুলকে সঠিক করা। শিশু শুরুতেই বিশ্বাস করে তার মাকে। মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শিশুকাল। বাবা-মা ইচ্ছা করলে এই সময়টাতে একটি সন্তানকে সুসন্তান কিংবা কুসন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। কেননা শিশুর মানসিক বিকাশের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রত্যেক সন্তান তার বাবা-মাকে অন্ধভাবে অনুসরণ-অনুকরণ করে। মা যদি চন্দ্রকে সূর্য্য কিংবা আকাশকে পাহাড় নামে শিশুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তবে শিশুর সে ধারণ ভাঙতে বহু বছর লেগে যায়; আবার কখনো সে ভাবনা থেকে শিশু বের হতেই পারে না। এর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পাবো আমাদের শৈশবকে স্মৃতির ক্যানভাসে উপস্থিত করলে। শৈশবের অনেক ধারণা থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনি কিংবা বোধহয় পারবোও না কোনদিন। শৈশবে শোনা কিংবা শেখা কুসংস্কাগুলো যেন আজ রীতিতে পরিণত হচ্ছে। সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের এই সময়টাতে যদি কোন প্রকার দূরত্ব তৈরি হয় তবে সে সন্তানের মনে বাবা-মায়ের প্রতি পূর্ণ ভালোবাস জন্মাবে না; জন্মাতে পারে না।
লেখালেখির জীবনে যে লেখাটি সর্বাধিক পাঠপ্রিয়তা পেয়েছে সেটি বৃদ্ধাশ্রম থেকে সন্তানকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিঠি। মূদ্রিত পত্রিকা, বিভিন্ন অনলাইন পোর্ট্রাল কিংবা দেশ বিদেশের অসংখ্য জনপ্রিয় পেইজে লেখাটি নামে-বেনামে প্রকাশিত হয়েছে। আমি সেখানে পাঠকের মন্তব্য মনযোগ দিয়ে পড়েছি। এমন কোন মন্তব্য পাইনি যাতে বৃদ্ধাশ্রমকে ভালো স্থান, সুখের স্থান বলা হয়েছে। অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছে কিংবা কল্পিত সন্তানটিকে গালমন্দও করেছে। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, আমাদের সন্তানদের মধ্যে পিতামাতার প্রতি অসীম ভালোবাসা রয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমের যে ব্যাপারগুলো দেশে ঘটছে তার অধিকাংশ অধিক শিক্ষিত সন্তানের পিতামাতার ক্ষেত্রে। বাকী ঘটনাগুলোর বেশিরভাগ সহায়সম্বলহীন পিতামাতার কিংবা ছেলে-সন্তান পরবাসে থাকাদের। পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপারটিকে সবাই স্বাভাবিকভাবে তাদের পরিণতি হিসেবেই গ্রহন করেছেন কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সে অবস্থা তৈরি হয়নি যাতে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং পিতামাতা বৃদ্ধ হলেই তাদের বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা বানাতে হবে। তবুও অনাকাঙ্খিতভাবে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও বাড়ছে এবং শহরবাসীদের কতিপয়ের পিতামাতার শেষ আশ্রয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। তাদের সংখ্যাটা এখনো আশঙ্কাজনক না হলেও অদূর ভবিষ্যতে যে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে এদেশেও বৃদ্ধাশ্রমে সংখ্যা এবং বৃদ্ধাশ্রমবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কেননা অবক্ষয় যে শুরু হয়েছে। 

আমরা এখনো বৃদ্ধাশ্রমকে যেভাবে ঘৃণা করি তার চেয়ে বেশি এড়িয়ে চলা উচিত ছিল শিশুদের লালন-পালন কেন্দ্রগুলো। সারাদিন বাবা-মায়ের সঙ্গহীন হয়ে যে শিশু অন্যের আদরে-অবজ্ঞায় বেড়ে ওঠে সে শিশুর মনে বাবা-মায়ের জন্য ততোটা ভালোবাসা জন্মায় না ঠিক যতটা মায়ের কোলে হেসে খেলে বেড়ে ওঠা শিশুদের মনে জন্মায়। চাকরিজীবি বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে তাদের সন্তানকে শিশু লালন-পালন কেন্দ্রে রেখে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তাদের স্বপক্ষে হয়ত বহু যুক্তিও আছে। দিন শেষে তাদের অনেকেই শিশুকে তাদের কাছে হয়ত নিয়েও আসেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের শারীরীক সক্ষমতা যতটুকু তাতে সারাদিন কাজের ধকল শেষে সন্তানকে রাতে কতটুকু সময় দিতে পারেন তা প্রশ্নবিদ্ধ। দিনের অল্প একটু সময়ে বাবা-মায়ের সান্নিধ্য শিশুর মনে তাদের প্রতি কতটুকু স্থান দখল করে তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। এছাড়া ধণাঢ্য বাবা-মায়ের সন্তান বেড়ে ওঠে বুয়াদের তথা গৃহপরিচারিকার কোলে-কাখে। একথা বললে তিক্ত শোনাবে তবুও বলতে হচ্ছে, একটি অবুঝ শিশু যখন সারাদিন কাজের বুয়ার সান্নিধ্য পায় তখন এ মহিলাকে মা ভেবেই শিশুর মনে গভীর দাগ কাটে। একটু বড় হয়ে যখন শিশু বুঝতে পারে, সে যাকে মা ভেবে এসেছে সে তার মা নয় তখন জন্মাদাত্রী মা ও পালনকারী মা-এ দু’মায়ের থেকেই তার দূরত্ব তৈরি হয়। এর পরিণতিও খুব বেশি ভালো হয়না কিংবা হতে পারে না। 

শিশুর মৌলিক অধিকার তথা বাবা-মা থেকে আদর ভালোবাসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত উচ্চ শিক্ষিত কর্মজীবি বাবা-মা, ধণাঢ্য বাবা-মায়ের সন্তানের। অবক্ষয়ও মূলত তাদের সমাজে বেশি। আর বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বেশি সংখ্যাও গণন হচ্ছে এই শ্রেণীর বাবা-মাকে ঘিরে। ছোট বেলায় সন্তানের সাথে যে বাবা-মায়ের আত্মিক সম্পর্কই গড়ে ওঠে না সেই সন্তান যখন সংসারের দায়িত্ব পায় এবং বাবা-মা যখন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয় তখন তাদের পরিণতি অবধারিতভাবেই বৃদ্ধাশ্রম।পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার যেসকল কারণ আমাদের দেশে সেসব কারণ এখনও সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত না হলেও উপস্থিতের লক্ষণগুলো উপস্থিত। কাজেই সন্তানের লালন-পালনে পিতামাতার সতর্কতা খুব বেশি আবশ্যক। আসল সময়ে যোগ্য পিতামাতা হতে না পারলে অসহায় সময়ে সন্তানকে যোগ্য সন্তানের ভূমিকায় প্রাপ্তির সম্ভাবনা শুণ্যের কোঠায়। জীবনে চলার জন্য খুব বেশি অর্থ-বিত্তের প্রয়োজন আছে এমনটা নয় কিন্তু সম্মান শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ছাড়া এক মূহুর্ত বেঁচে থাকাই মুশকিল। সময়ের কাজ সময়ে না করলে অসহায় সময় বুক ভাসিয়ে চোখের জল ফেলা যায় কিন্তু ভুল শোধরাণোর খুব বেশি উপায় থাকে না। কাজেই বাবা-মা সচেতন হলে তাদের সন্তান সচেতন হবেই। মা-বাবার সাথে কিভাবে সন্তানের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় সে ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবে। জন্মদিয়েই যেমন জন্মদাতা-জন্মাদাত্রী হওয়া যায় না তেমনি টাকা-পয়সার ছায়ায় মানুষ করেই সন্তানের যোগ্য পিতামাতা হওয়া যায়না। আজকে শিশুর সকল অধিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিলেই কেবল সে শিশুর দ্বারা আপনার অসহায় সময়ের অধিকার রক্ষিত হওয়ার দাবী করতে পারেন; নচেৎ না। কেননা বর্তমান সময়টা যতটা মানবিক তার চেয়ে অনেক বেশি যান্ত্রিক। যান্ত্রিক সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে যেন আমরাও যন্ত্রে পরিণত না হই। 


লেখক : কলামিষ্ট। 
Facebook.com/rajucolumnist/ 

 

 


প্রহরনিউজ/পাঠকের মতামত/তামান্না/২২ অক্টোবর, ২০১৫