রবিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ৪:১৪ pm
হাজার বছরের পুরনো বড় হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির
সোমবার ১০ এপ্রিল ২০১৭ , ২:১৬ pm
বড় হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির.jpeg

ঢাকা : হাজার বছরের পুরনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরটি উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত বলে একে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির নামেও ডাকা হয়। তবে স্থানীয়ভাবে এটি দোলমঞ্চ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে আবিষ্কৃত নবরত্ন মন্দিরসমূহের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।

ইতিহাস
নবরত্ন মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় এখানে কোন শিলালিপির অস্তিত্ব ছিল না বলে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি অনুসারে, মন্দিরটি ১৬৬৪ সালের দিকে রামনাথ ভাদুরী নামে স্থানীয় এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন আরও পরে, মন্দিরটি বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময়কাল ১৭০৪ থেকে ১৭২৮ সালের মধ্যে কোন এক সময় নির্মাণ করা হয়েছিল।[২]

কিংবদন্তী অনুসারে, রামনাথ ভাদুরী দিনাজপুরের তৎকালীন রাজা প্রাণনাথের বন্ধু ছিলেন। ভাদুরী তাঁর বন্ধুকে তাঁর রাজ্যের রাজস্ব পরিশোধে একবার সাহায্য করেছিলেন। তারই ফলস্বরূপ প্রাণনাথ দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দিরের অদলে সিরাজগঞ্জে এই মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন ভাদুরী তার নিজস্ব অর্থ ব্যয় করেই এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। [৩]

অবকাঠামো
নবরত্ন মন্দিরটি তিনতলাবিশিষ্ট ও এর দেয়ালে প্রচুর পোড়ামাটির নকশা করা রয়েছে। শক্ত একটি মঞ্চের উপর স্থাপিত মন্দিরটির আয়তন ১৫ বর্গমিটার এর উপর। যে স্তম্ভগুলোর মাধ্যমে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তার প্রতিটি স্তম্ভের দৈর্ঘ্য ১৫.৪ মিটার ও প্রস্থ ১৩.২৫ মিটার। [২] নবরত্ন নামটি এসেছে মন্দিরের উপর বসানো নয়টি চূরা থেকে যেগুলো বর্তমানে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

নবরত্ন মন্দিরটি ৭টি বারান্দা ও ৫টি দরজার সমন্বয়ে গঠিত। নবরত্ন মন্দিরের পাশাপাশি আরও তিনটি মন্দির রয়েছে।

প্রায় পাঁচশ’ বছরের পুরনো প্রত্মতাত্তিক নিদর্শন চলনবিল এলাকার হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। তিন তলা বিশিষ্ট এই মন্দিরের চারপাশের দেয়াল পোড়ামাটির অলঙ্করণে ভরপুর।

স্থানীয়ভাবে ‘দোলমঞ্চ’ নামে পরিচিত। চলনবিলাঞ্চলের সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানায় অবস্থিত এই মন্দিরই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির। সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের হাটিকুমরুল বাস স্টেশন। এখান থেকে ছোট্ট একটি মেঠোপথ আঁকাবাঁকা চলে গেছে উত্তর-পূর্ব দিকে। এই পথে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই দেখা মিলবে পোড়ামাটির কাব্যে গাঁথা অনন্য এক প্রত্মতাত্তিক নিদর্শন।

বাংলাদেশে প্রাচীন যেসব হিন্দু মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলোর অন্যতম একটি এই হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। নির্মাণশৈলীর দিক থেকে উঁচু একটি বেদির ওপর নবরত্ন পরিকল্পনায় নির্মিত মন্দিরের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১৫.৪ মিটার এবং প্রস্থ ১৩.২৫ মিটার। তিন তলাবিশিষ্ট এই স্থাপনার ওপরের রত্ন বা চূড়াগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। মূল মন্দিরের বারান্দায় সাতটি এবং ভেতরের দিকে পাঁচটি প্রবেশপথ আছে। দ্বিতীয় তলায় কোনো বারান্দা নেই। হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির তিন তলা বিশিষ্ট।

মূল মন্দিরের আয়তন ১৫ বর্গ মিটারেরও বেশি। এক সময় মন্দিরে ৯টি চূড়া ছিল বলে নবরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিতি পায় এটি। পুরো মন্দিরের বাইরের দিক পোড়ামাটির অলঙ্করণে ঢাকা। এসব অলঙ্করণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা দেব-দেবীর মূর্তি, লতা-পাতা ইত্যাদি। মন্দিরের নির্মাণ সময় সম্পর্কিত কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। আনুমানিক ১৭০৪-১৭২৮ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ ভাদুরী নামে জনৈক তহসিলদার এই মন্দির নির্মাণ করেন বলে জানা যায়।

স্থানীয়রা জানান, রামনাথ জমিদার ছিলেন। এ মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে এ অঞ্চলে। কথিত আছে, দিনাজপুরের রাজা প্রাণনাথের কাছের মানুষ ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুরী। প্রাণনাথ দিনাজপুরে ঐতিহাসিক কান্তজীর মন্দির নির্মাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে সঙ্কটে পড়েন। ফলে বছরের রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। সে সময় তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন বন্ধু রামনাথ ভাদুরী। নিজ কোষাগারের টাকা দিয়ে রাজা প্রাণনাথের বকেয়া পরিশোধ করে দেন তিনি। তবে এই অর্থ ফেরতের শর্ত হিসেবে কান্তজীর মন্দিরের মতো করে হাটিকুমরুলে একটি মন্দির নির্মাণের অনুরোধ জানান। রামনাথ ভাদুরীর শর্তানুসারেই রাজা প্রাণনাথ কান্তজীর আদলে হাটিকুমরুলে এ নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করে দেন।

আবার অনেকের মতে, রাখাল জমিদার হিসেবে পরিচিত রামনাথ ভাদুরী তার জমিদারির সঞ্চিত অর্থ দিয়েই এ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরের আশপাশে আরও তিনটি ছোট মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশে আছে শিব-পার্বতী মন্দির। পাশে দোচালা আকৃতির আরেকটি মন্দির এবং দক্ষিণ পাশের পুকুরের পশ্চিমপাড়ে আছে শিব মন্দির। সব মন্দিরই বর্তমানে দেখ ভাল করছে সরকারের প্রত্মত্বত অধিদফতর। তবে স্থায়ী কর্মচারী না থাকায় মন্দিরটির দেখ ভাল করতে সমস্যা হচ্ছে। মোতালেব নামে একজন অস্থায়ী কর্মচারী এখানে কর্মরত থাকলেও নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় তারও মনোযোগ নেই মন্দিরের প্রতি। এদিকে দীর্ঘদিনেও মন্দিরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি পাকা করা হয়নি। যে কারণে পর্যটকসহ সাধারণের প্রবেশে সমস্যা হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যে কয়টি প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হলো সিরাজগঞ্জ জেলার প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে হাটিকুমরুল ইউনিয়নে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, আনুমানিক ১৭০৪ থেকে ১৭২০ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে তার জনৈক নায়েব রামনাথ ভাদুরী এই মন্দির স্থাপন করেন। জানা যায়, মথুরার রাজা প্রাণনাথের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুরী।

প্রাণনাথ দিনাজপুর জেলার ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংকটে পড়ে যান এবং তিনি বাত্সরিক রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। সে সময় বন্ধুত্বের খাতিরে নিজ কোষাগার থেকে টাকা দিয়ে রাজা প্রাণনাথের বকেয়া শোধ করেন রামনাথ ভাদুরী। তবে তিনি এই অর্থ প্রদানের শর্ত হিসেবে দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের আদলে হাটিকুমরুলে ১টি মন্দির নির্মাণের দাবি জানান। পরবর্তী সময়ে রামনাথ ভাদুরীর শর্ত পূরণ করতেই রাজা প্রাণনাথ কান্তজির মন্দিরের অবিকল নকশায় হাটিকুমরুলে এ নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করে দেন। এদিকে অপর একদল ঐতিহাসিকের মতে, রাজা প্রাণনাথ নন, বরং রাখাল জমিদার নামে পরিচিত রামনাথ ভাদুরী তার জমিদারি আয়ের সঞ্চিত কোষাগারের অর্থ দিয়েই এ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

প্রাচীন স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই নবরত্ন মন্দিরের মূল মন্দিরটি তিনতলা বিশিষ্ট। এ ছাড়া মূল মন্দিরের আশেপাশেই রয়েছে আরও কয়েকটি দোচালা ও আটকোনাকৃতি মঠ সদৃশ মন্দির। এক সময় প্রায় বারো শতক জায়গার ওপর নির্মিত মূল মন্দিরটির আয়তন ছিল প্রায় ১৫.৪ বর্গমিটার। আর পোড়ামাটির ফলকে লতা-পাতা ও দেব-দেবীর মূর্তি সদৃশ কারুকাজ দিয়ে গড়ে তোলা মন্দিরটিতে মোট চূড়ার সংখ্যা ছিল নয়টি। মূলত এ কারণেই মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির নামে পরিচিতি পায়।

এ ছাড়া অনেকে এটিকে দোল মন্দির হিসেবেও আখ্যায়িত করতেন। নবরত্ন মন্দিরের বিশাল চত্বরে বিক্ষিপ্তভাবে আরও ৩টি মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশেই শিব-পার্বতী মন্দির, তার পাশে দোচালা চণ্ডি মন্দির এবং দক্ষিণপাশে পুকুরের পাড় ঘেঁষে রয়েছে পোড়ামাটির টেরাকোটা কারুকার্যখচিত শিবমন্দির। বহুকাল ধরে মহা ধুমধামে এ ৪টি মন্দিরেই পূজা অর্চনা করা হতো।

তবে কালের বিবর্তনে ভারত উপমহাদেশে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি, দেশ বিভাগ ও নানা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পড়া এই মন্দিরটি থেকে নানা সময়ে মূল্যবান সব সামগ্রী খোয়া যায়। তবে স্বাধীনতার পর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পর্যায়ক্রমে এটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে।-ইন্টারনেট।