বুধবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ২:৪৮ am
চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে!
বুধবার ৫ জুলাই ২০১৭ , ১:৫৯ pm
চিকুনগুনিয়া

স্বাস্থ্য ডেস্ক
ঢাকা:
এবোলা কিংবা জিকা ভাইরাস নিয়ে সরকারের আগাম সর্বাত্মক তত্পরতা ছিল দেশজুড়ে। জারি করা হয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগীয় জরুরি অবস্থা। প্রচার-প্রচারণা ও বিভিন্ন পদক্ষেপের কমতি ছিল না। শেষ পর্যন্ত ওই দুই ভাইরাসের কোনোটিই আসেনি দেশে। ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমে যাওয়ায় এই ভাইরাস নিয়েও সরকারের অবস্থান ছিল অনেকটাই ঢিলেঢালা। এমন অবস্থার মাঝেই অনেকটা হাঠৎ করে প্রথমে ঢাকা এবং এখন দেশজুড়ে জেঁকে বসা চিকুনগুনিয়া সামাল দেওয়া নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। রাজধানীতে ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়া দেখা দিয়েছে বা দিচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বর হলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে হাসপাতালে ভর্তিকে নিরুৎসাহ করা হলেও অনেকে ঘরোয়া চিকিৎসায় ভরসা পাচ্ছে না। প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।

পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের। স্বাস্থ্য বিভাগ এত দিন জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশা নিধনকেই মূল ফোকাসে রেখেছে। চিকিৎসার বিষয়টি থেকে গেছে জগাখিচুড়ি পরিস্থিতিতে। অন্যান্য জটিল রোগের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে কারো কারো মৃত্যুর খবরও আসছে, কিন্তু এটিকে চিকুনগুনিয়ার কারণে মৃত্যু বলে মানতে নারাজ স্বাস্থ্য বিভাগ। ঈদের বন্ধের আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উদ্যোগের সব সভায়ই মন্ত্রীসহ অন্যরা বারবারই বলে এসেছেন চিকুনগুনিয়া নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখেও এমন আশ্বাস ছিল।

এ ভাইরাসের বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অনেক দেরিতে হলেও গতকাল সোমবার থেকে সারা দেশে চালু হয়েছে চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। সেই সঙ্গে গতকাল বিকেল ৩টায় অল্প সময়ের নোটিশেই চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে পরবর্তী  করণীয় সম্পর্কে ঠিক করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের মেয়রকে পাশে নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী-গবেষকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বৈঠকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মন্ত্রী ও মেয়রের সামনে চিকনগুনিয়া নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।  

গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে দেশে দুই হাজারের বেশি মানুষ চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কথা স্বীকার করা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে জানান চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর ৫০টি এলাকায় জরিপ করে দেখতে পেয়েছে, প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি চিকনগুনিয়ার সংক্রমণ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) যৌথভাবে এ জরিপ করে। জরিপের প্রতিবেদনে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন সংখ্যাতত্ত্বে লাল চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। এতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩টি এলাকার মধ্যে ২৭টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২১টি এলাকার মধ্যে ১৭টি লাল চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে চিকনগুনিয়ার সংক্রমণের দিক থেকে। এর মধ্যে যেমন মিন্টো রোড, বেইলি রোডের ভিআইপি এলাকা রয়েছে তেমনি মিরপুর বা মোহাম্মদপুরের মতো এলাকায় চিকনগুনিয়ার সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের উচিত প্রকৃত চিত্র বের করে মানুষকে জানানো। এ ক্ষেত্রে লুকোচুরির কিছু নেই। প্রতিদিন যেভাবে ঘরে ঘরে, ডাক্তারের চেম্বারে চেম্বারে চিকনগুনিয়া রোগীর ভিড় দেখা যায় তাতে এই সংখ্যা এখন আর হাজারের কোটায় আছে বলে মনে হয় না। কারণ আমরাই দেখতে পাচ্ছি, এক ঘরে একজনের চিকনগুনিয়া হলে অল্প সময়ের মধ্য ঘরের অন্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এটা এখন রীতিমতো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাই সরকারের একার পক্ষে এটা সামাল দেওয়া সম্ভব না হলে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। ’

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকনগুনিয়া আর ডেঙ্গুর উপসর্গ অনেকটা একই রকম। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ের কারণ থাকলেও চিকনগুনিয়ায় ভয়ের কোনো কারণ নেই। এতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা খুবই নগণ্য, তবে আক্রান্তকে বেশ কিছুদিন ভুগতে হয় অত্যন্ত দুর্বলতা ও ব্যথা নিয়ে। আর চিকনগুনিয়ার চিকিৎসাও খুবই সহজ, সাধারণ জ্বরের চিকিৎসায়ই মানুষ সেরে ওঠে। যদি অন্য কোনো জটিলতা না থাকে তবে কেবল চিকনগুনিয়ার জন্য আলাদা কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিশ্বের আরো কিছু দেশেও চিকনগুনিয়া নিয়ে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটিকে বিপজ্জনক কোনো রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বা তালিকাভুক্ত করেনি। এমনকি বিশ্বের কোন কোন দেশে চিকনগুনিয়ায় কতসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত, এর কোনো পরিসংখ্যানও নেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে। তবে আমরা আমাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সার্বক্ষণিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ’

মহাপরিচালক বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের পক্ষে চিকনগুনিয়ার উৎস বা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কাজ আর মানুষের সচেতনতাই মুখ্য। আমরা কেবল পারি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে আর আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কাজ করতে। এ জন্য আমাদের যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আছে। ’

গতকাল থেকে সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু হলেও ঢাকার বাইরে আক্রান্তের ব্যাপারে গতকাল বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো তথ্য মেলেনি। যদিও ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গত ৫ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত তাদের কাছে মাত্র ৩৩৪ জন চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মাত্র একজন। তবে এই তথ্য ঢাকার সব হাসপাতাল বা দেশের সব হাসপাতালের নয়, কেবল যে কয়টি হাসপাতাল থেকে তথ্য পাঠানো হয়েছে সেগুলোই ওই কন্ট্রোল রুমে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকিগুলো জানা যায়নি।

জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত সারা দেশে দুই হাজার জনের কিছু বেশি মানুষ চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া কেবল আইইডিসিআরের গবেষণাগারে পরীক্ষা করা ৬৫৬টি নমুনার মধ্যে ৫২৬টিতেই চিকনগুনিয়া ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এই নমুনাগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। ’

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলেও ভয়ের কিছু নেই। জ্বর কমে গেলেও অনেক দিন ধরে ব্যথা থাকতে পারে। এটা সবার জানা থাকা জরুরি। কিন্তু চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ হলেও ‘চিকনগুনিয়া’ শনাক্তকরণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়ঝাঁপের কোনো দরকার নেই। কারণ দেশে চিকনগুনিয়া শনাক্তকরণের জন্য এখন পর্যন্ত কেবল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে  কার্যকর প্রযুক্তি আছে, এ ছাড়া অন্য কোথাও শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানেই নেই। ফলে চিকনগুনিয়ার পরীক্ষা করা না করা সমান কথা, এতে বরং পয়সা আর সময় নষ্ট হবে কিংবা ভুল রিপোর্টে চিকিৎসায় বিভ্রান্তি বাড়বে; লাভবান হবে কিছু চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। তাই চিকনগুনিয়ার পরীক্ষা না করে বরং ডেঙ্গুর আশঙ্কা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা করানো ভালো। এ ছাড়া আইইডিসিআরে সাধারণভাবে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত ব্যবস্থাও নেই, ব্যয়বহুল এই পরীক্ষা খুবই সীমিত আকারে করা হয় কেবল কোনো প্রতিষ্ঠানের স্যাম্পল পাঠানো সাপেক্ষে। এ ছাড়া চিকনগুনিয়ার পরীক্ষা অনেক ব্যয়বহুলও।

সংবাদ সম্মেলন : গতকাল সচিবালয়ে চিকনগুনিয়া নিয়ে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মশক নিধন কার্যক্রমকে আরো জোরালো করতে সিটি করপোরেশনে জনবল আরো বাড়ানোর আহ্বান জানান। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্য চিকুনগুনিয়া রোগ নিয়োন্ত্রণে আসবে জানিয়ে বলেন, চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কার্যক্রম চলছে। মেয়র সিটি করপোরেশনের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বলেন, শিগগিরই লোক নিয়োগে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা সরকারের সাম্প্রতিক সময়ের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, চিকনগুনিয়া হচ্ছে টোগা বা আরবো গোত্রের একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাথাব্যথা, সর্দি, বমি বমিভাব, হাত ও পায়ের গিঁটে এবং আঙুলের গিঁটে ব্যথা, ফোসকা পড়া, র‌্যাশ ছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরীর বেঁকে যেতে পারে। ডেঙ্গুর মতোই এডিস মশা থেকেই এ ভাইরাস মানুষের শরীরে আসে। আবার আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশাও আক্রান্ত হয় এবং বাহক হিসেবে আবার মানবদেহে প্রবেশ করে। সাধারণত মশায় কামড়ানোর পাঁচ দিন পর থেকে শরীরে লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে। সাধারণ প্যারাসিটামল ধরনের ওষুধেই এ রোগ সেরে গেলেও অনেক দিন পর্যন্ত শরীরে ব্যথা ও প্রচণ্ড দুর্বলতা থেকে যায়। এ ছাড়া এই ভাইরাসের উৎস ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি, ফুলের টব, ফেলে রাখা কৌটা বা বোতল, পানির ট্যাংক, ছাদে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি, আবর্জনার স্তূপ বা ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিতেও জন্ম নেয় এডিস মশা।

সূত্র : কালেরকণ্ঠ