বুধবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ২:৪৮ am
চিকুনগুনিয়ার বিস্তারে দায় নেই ভাবছে সিটি করপোরেশন
বৃহস্পতিবার ১৩ জুলাই ২০১৭ , ১২:১৯ pm
চিকুনগুনিয়া.jpg

স্বাস্থ্য ডেস্ক
ঢাকা
: রাজধানীতে এডিস মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়ার ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ডেঙ্গু নিয়েও সতর্ক করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। এরই মধ্যে সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ স্বা্স্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নিজেদের কোনো ব্যর্থতা স্বীকার করতে নারাজ। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দাবি, তাদের মশা নিধন কার্যক্রম নিয়মিত চালানো হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শেখ সালাউদ্দিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মশা বেড়ে গেছে এই কথাটি আমি বিশ্বাস করছি না। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এখন মশা অনেক কম।’ তিনি বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া আছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে ঢাকা শহরে প্রায় ৪৫% মানুষ এখনও মশারি ব্যবহার করে না। এটাও চিকুনগুনিয়া বিস্তারের একটি কারণ।’

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কর্মীরা আরও সক্রিয় হলেও চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরবাসীকেই বেশি সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার জন্ম হয় ঘরের ভেতর বা বারান্দা ও ছাদে জমে থাকা পরিস্কার পানিতে। এসব বিষয়ে নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘এডিস মশা মুলত বাড়িতেই জন্ম হয়। আমাদের মূল টার্গেট কিউলেস মশা, আমরা এডিস মশার ভিতরে ঢুকতে পারছি না। একজন মানুষের ছাদের উপরে পানি জমে থাকলে আমরা তো সেখানে যেতে পারছি না। তার পর কিছু প্লট আছে নির্মাণাধীন, সেগুলোর ছাদে পানি জমে আছে, আমরা যেতে পারছি না ওখানে। ওই জায়গাগুলিতে এডিস মশা বেশি উৎপন্ন হচ্ছে। সেখানে আমাদের ৯৯% এক্সসেস নাই।’

সালাউদ্দিন বলেন, ‘একজনের বাড়িতে যদি পানি জমে থাকে, ছাদে যদি পানি জমে থাকে, সেগুলো কি আমরা নিধন করতে পারব? আমাদের পক্ষে এগুলো পারা কিন্তু কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। আমরা যদি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি, প্রচারণা বেশি করে করতে পারি তবেই সম্ভব।’

এই সচেতনতা বাড়াতে সিটি করপোরেশনের কী পদক্ষেপ-জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা স্কুল ছাত্র, শিক্ষকদের বোঝাচ্ছি। তাদের নিয়ে বের হচ্ছি, লিফলেট বিতরণ করছি। প্রত্যেকে যেন তাদের বাড়িতে গিয়ে এই বিষয়গুলি সচেতন করে। কোথাও যেন স্বচ্ছ পানি জমে না থাকে। তাহলেই এডিস মশা উৎপন্ন বন্ধ হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এস এম এম সালেহ ভুঁইয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘শুধু ডিএনসিসি মশা নিধন করলে হবে না। নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। জনসচেতনার জন্য র‌্যালি, সভা, মাইকিং, বিজ্ঞাপন আমাদের ওয়েবসাইটে প্রচার করে যাচ্ছি।’

দুই সিটি করপোরেশনের তৎপরতা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মশা নিধন কার্যক্রমে সিটি করপোরেশনের গত বছরে বাজেট ছিল ১১.৫ কোটি টাকা। এ বছর এখনও বাজেট চূড়ান্ত হয়নি। এই ওষুধ ছিটাতে নিয়মিত লোকবল আছে ৩০৬ জন এবং চুক্তিভিত্তিক ১০৮ জন। অসুস্থতা ছাড়া প্রায় শতভাগ লোকবল মশা নিধন কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নেয় বলে দাবি সিটি করপোরেশনের।

করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শেখ সালাউদ্দিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মশা নিধনে আমাদের সব ধরনের কার্যক্রম চলমান আছে। প্রতিদিন সকাল ৭ থেকে ৮ টা এবং চারটা থেকে সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত মশক নিধন বাহিনী মশা নিধন করে।’

শেখ সালাউদ্দিন বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে জুন মাসের ১৮ তারিখ থেকে বাড়তি ১০৮ জন অতিরিক্ত লোক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাস একটানা সিটি করপোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডে মশা নিধন কার্যক্রম চলবে।’

দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রম আমরা মনিটর করছি, এর বাইরে জনপ্রতিনিধিরাও মনিটর করছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের লোকবল দিয়েও মশক নিধন কার্যক্রম সুপারভাইজ করা হচ্ছে। চিকুনগুনিয়ার প্রভাবের পর প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন করে অফিসার মশক নিধন কার্যক্রম সুপারভাইজ করছে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে মনিটর করার পাশাপাশি আমরা হেড কোয়ার্টার থেকেও রেনডমলি মনিটর করছি। আমি নিজেও এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মনিটর করছি।’

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এস এম এম সালেহ ভুঁইয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রম চলমান আছে। রমজানের আগে ২০-২৫ মে একটি ক্রাস প্রোগাম শেষ করেছি। সকালে লার্ভিস লাইট এবং বিকালে ফগিং কার্যক্রম করা হয়। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনে জনবলের অভাব থাকার কারণে কাজগুলো ঠিকমতো মনিটরিং করা যাচ্ছে না।’

মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ
তবে মশা নিধন কার্য্যক্রম নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতা নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেছেন, ‘তাদের অদক্ষতায় আজ রাজধানীতে চিকুনগুনিয়া রোগের বিস্তার ঘটেছে। রাজধানী পরিস্কার রাখা আমাদের কাজ না। রাজধানী পরিস্কার এবং মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।’

স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেকও দুই সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেছেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং উত্তর সিটি করপোরেশনকে চিকুনগুনিয়া এবং ডেঙ্গুর দায়দায়িত্ব নিতে হবে। মশার বংশ বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। তারা নগরীর জলাশয়গুলি সময়মতো পরিষ্কার করতে ব্যার্থ হয়েছে। মশার প্রজনন মওসুমের আগেই জলাশয়গুলি পরিস্কার করতে হবে।

এই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মতো মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরছে নগরবাসী। সপ্তাহের শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন মশা নিধন কার্যক্রম চালানোর কথা থাকলেও সেই ভাবে কার্যক্রম চলছে না বলে অনেকে অভিযোগ করছেন।

সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, গেন্ডারিয়া, সায়দাবাদ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিনে ঘুরে কোথাও মশা নিধনে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ, দনিয়া, ধোলাইপাড়, দয়াগঞ্জ, টিকাটুলি, মতিঝিল, ফকিরাপুল, পান্থপথ, খিলগাঁও, বাসাবো, রাজারবাগ, মাদারটেক, মুগদাপাড়া, কামরাঙ্গীচর, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকার তাঁতি বাজার, ইসলামপুর, বাবুবাজার, লালবাগ, সায়েদাবাদ, আজিমপুর, হাজারীবাগ, বংশাল, অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ উত্তর সিটি করপোরেশনের মগবাজার, মধুবাগ, হাতিরঝিল, বেগুনবাড়ি, কুনিপাড়া, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া, রামপুরা, বাড্ডা, আফতাবনগর, বনশ্রী, তেজগাঁও, কাওরানবাজার, ফার্মগেট, রাজাবাজার, মনিপুরিপাড়া, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী, মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, পল্লবী, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, মহাখালী, কড়াইল, আব্দুল্লাহপুর, খিলক্ষেত এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি।

মতিঝিলের বাসিন্দা ইলিয়াস আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মশার যন্ত্রণা এত বেশি বেড়েছে যে এখন রাত-দিন সব সময় কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। রাতের বেলা মশার অত্যাচারে মশারির ভেতর থেকে বের হওয়া যায় না।’

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা হাকিম মিয়া বলেন, ‘মশানিধনে সিটি করপোরেশন তেমন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এলাকায় গত দুই মাসেও মশার ওষুধ ছিটানোর নজির দেখতে পাচ্ছি না। সন্ধ্যা হতে না হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা আসে ঘরের মধ্যে।’

বাসাবোর আশিক মাহমুদ বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই মশার অত্যাচার বেড়ে গেছে। রাত-দিন সমানতালেই চলছে মশার আক্রমণ। আর মশার কামড়ে আশেপাশের অনেকের চিকুনগুনিয়া হয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তেমন কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’

গেন্ডারিয়ার মোহসিন হোসেন বলেন, ‘মশার অত্যাচারে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। দল বেঁধে মশা আসে। আর কয়েল? সে তো মশার বন্ধু। জ্বলিয়ে কোনো কাজ হয় না। কবে যে আমারও চিকুনগুনিয়া হয় তাই ভাবছি।’


সূত্র : ঢাকাটাইমস

 

প্রহরনিউজ/স্বাস্থ্য