বুধবার ২৪ জানুয়ারী ২০১৮ || সময়- ২:১২ am
চাকরির আবেদনে নারীর ঠিকানা শুধু স্বামীর বাড়ি!
মঙ্গলবার ২৫ জুলাই ২০১৭ , ১২:২১ pm
চাকরির আবেদনে

ক্যারিয়ার ডেস্ক
ঢাকা
: রিমা রশিদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর। স্বামী বিদেশে থাকেন। রিমা থাকেন মায়ের বাসায়। একটি ব্যাংকের চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। কারণ, স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা না লিখে সাবমিট দিলে আবেদন পোস্ট হয় না। আবেদনের এই ঘরটিতে লাল তারকা চিহ্ন দেওয়া, যার অর্থ এটি অবশ্যই পূরণ করতে হবে। রিমার প্রশ্ন- ২৮ বছর যে মা-বাবার বাসা তার স্থায়ী ঠিকানা ছিল, সেটি স্বামীর ঠিকানা দিয়ে ‘রিপ্লেস’ হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনপত্রে এই ঘরটি নারীর বিবাহিত জীবনের সামাজিক বাস্তবতা থেকেই তৈরি করা। কারোর ব্যক্তিগত ‘সংবেদনশীলতা’ থাকলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেটি ‘ডিল’ করতে পারেন। আর আইনজীবীরা বলছেন, ‘বিবাহিত’ স্ট্যাটাস যার যার ব্যক্তিগত। আবেদনকারী যে স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করতে চান, করতে পারেন। এতে আইনত কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি বেশ কয়েকটি ব্যাংকে অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে সম্প্রতি রিমার মতো এমন প্রশ্ন তোলেন বেশ কয়েকজন নারী। বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের ঘর দেখিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবেদনকারী বলেন, ‘চাকরি আমাদের কাছে সোনার হরিণ, কিন্তু তা সম্মান বিকিয়ে দিয়ে নেবো কিনা সে প্রশ্নও তোলা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে নারীরা অলরেডি ব্যাংকে কাজ করছেন তাদের উচিত ভেতর থেকে আওয়াজ তোলা। তাতে হয়তো অন্য নারীরা এই হয়রানি থেকে মুক্তি পাবে।’ রিমা রশিদ বলেন, ‘আমার এক বিবাহিত নারী বন্ধুর বিচ্ছেদ হয়নি, কিন্তু তারা একসঙ্গে থাকে না। এখন তার শ্বশুরবাড়িতে চাকরির কোনও কার্ড গেলে সে কিভাবে পাবে? সমাজে তো সব স্বামী-স্ত্রী এক রকমের জীবনযাপন করছে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত একজন নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা যারা ভেতরে আছি তারা অফিশিয়ালি বলার সুযোগ পাইনি। তবে আনঅফিশিয়ালি প্রতিবাদ করেছি। কেউ কেউ সমর্থন জানিয়েছেন, কেউ কেউ আমাদের দেশের সংস্কৃতির কথা তুলেছেন। মেয়েদের তো বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতেই থাকতে হয়, স্থায়ী ঠিকানা স্বামীরটা দিলে সমস্যা কী, এইসব আরকি।’ তিনি আরও বলেন,‘এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়, বিভ্রান্তির শিকারও হতে হয়। যেমন কেউ কেউ বলেই বসলো, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিবাহিত নারীদের নাগরিকত্বের সিস্টেমটাই নাকি এরকম। ব্রিটিশ কমন ল যারা ফলো করে সব দেশের সিস্টেম নাকি এইরকম।’

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এরকম আইনি কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। যে ব্যাংক অনলাইনে আবেদন নিচ্ছে,এটি  তাদের বিষয়। তারা যেভাবে বিষয়টা গ্রহণ করতে চায় সেভাবেই আবেদনের ঘর রেখেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুরুষের স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে যদি বাড়তি সতর্কতা না থাকে, তাহলে নারীর ঠিকানা নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন হচ্ছে কেন। আইনিভাবে ব্যক্তিবিশেষ বিবাহিত না অবিবাহিত সেটি জীবনের একটি স্ট্যাটাস মাত্র। এরসঙ্গে তার ঠিকানা পরিবর্তনের প্রয়োজন কেন হবে। বরং তার জাতীয় পরিচয়পত্রে যে ঠিকানা থাকবে, সেটিই তিনি লিখতে পারেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আসলে স্পষ্ট করার জন্য বিবাহিতদের ঠিকানা বিষয়টি এভাবে রাখতে চেয়েছি। যে নারী বিবাহিত এবং চাকরির বয়স আছে- তিনি আসলেই খুব বেশিদিনের বিবাহিত এমন নন। ফলে হুট করে যখন তার ঠিকানা বদলে যায়, তখন খটকা তৈরি করে। বিবাহিতরা যদি আলাদা করে ফরমের এই জায়গাটি পূরণ করেন তাহলে স্পষ্ট হয়ে যায় বিষয়টি।’ তিনি আরও  বলেন, ‘তবে কারোর যদি ব্যক্তিগত কোনও জটিলতা থেকে থাকে, সংবেদনশীল কিছু পরিস্থিতি জীবনে থাকে তাহলে অবশ্যই তিনি ব্যক্তিগতভাবেই সেই সুযোগটি নিতে চাইতে পারেন। আবেদনে নিজের মতো করে লিখতে পারেন বা নির্দিষ্ট চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া ব্যাংকে যোগাযোগ করতে পারেন।’ বিষয়টির আপত্তির জায়গাগুলোতে তার নজরে থাকলো বলেও  জানান শুভঙ্কর সাহা।

নারী নেত্রীরা মনে করছেন, এ ধরনের পৃথকীকরণ নারীকে অসম্মানিত করে। নারী যেখানে স্বস্তি বোধ করবে, সেটিই তার ঠিকানা হওয়া উচিত। পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের জেন্ডার বিষয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন ফৌজিয়া খন্দকার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিবাহিত না অবিবাহিত সেটি সবার ক্ষেত্রেই জিজ্ঞেস করা হয়। কিন্তু বিবাহিত নারীদের সুনির্দিষ্ট করে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে, পুরুষের জন্য এ ধরনের অপশন নেই। এখনকার সময়ে এসেও এ ধরনের বিভাজন অনাকাঙ্ক্ষিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিবাহিত নারীরা সবসময় স্বামীর স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি থাকেন- এখনকার সমাজ বাস্তবতা তা নয়। ফলে নারীকে চাকরির আবেদন করতে গিয়ে শুরুতেই হোঁচট খেতে হলে সেটি নেতিবাচক হবে।’

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ‘নারীর কোনও নিজস্ব বাড়ি নেই- এই ধারণাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এই আবেদন ফর্ম নেতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লক্ষ্য করবেন।’

নারীনেত্রী খুশি কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বামীর বাড়ি ছেলের বাড়ি নিয়েই নারীর জীবন- এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার বিপদ আছে। যারা ভুগছেন তাদের ভেতর থেকে প্রতিবাদ আসাটা ইতিবাচক। কিন্তু আমাদের কথা বলার পরও পরিবর্তন না আসলে সেটা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারীর ঠিকানা কী হবে সেটা সে নিজেই ঠিক করবে।’


সূত্র : বাংলাট্রিবিউন