বুধবার ২২ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ১০:৩৯ am
সরকারি কর্মকর্তাদের যুবতী মেয়ে উপহার দেয়া নিয়ম!
শুক্রবার ১১ আগস্ট ২০১৭ , ১১:০২ pm
যুবতী মেয়ে

প্রহরনিউজ, ঢাকা: থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত এক প্রদেশে কাজ করেন সরকারি কর্মকর্তা বুনিয়ারিত নাইপাওয়ানি। তাঁর দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যখন ওই প্রদেশে সফরে যান, তখন বুনিয়ারিত তাঁদের যেভাবে আপ্যায়ন করে, তা মোটামুটি একই রকম। বুনিয়ারিত তাঁদের ভালো ভালো পানীয় ও খাবার খাওয়ান। এরপরে নিয়ে আসেন কিশোরী মেয়েদের।

এই কিশোরীদের প্রায়ই ‘ফলাহার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শোভন ভাষায়, থাইল্যান্ডের এই ঐতিহ্যকে প্রকাশ করা হয় এভাবে: ‘খাবার খাওয়ার জন্য মাদুর বিছিয়ে দাও’। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আপ্যায়নের এ বিষয়টি বোঝাতে ওই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়।

থাই ঐতিহ্যের এই কদর্য অংশটি প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিষয়টি কিন্তু সেখানে সবারই জানা ছিল। তবে, এ নিয়ে আলোচনা হতো কদাচিৎ। কিশোরী মেয়েদের পাচারে পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশিত হলে দেশটির এই নির্মম ঐতিহ্যের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এই সংস্কৃতি বিনাশের দাবি ওঠে।

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত পার্বত্য প্রদেশ মায়ে অং সোনের আঞ্চলিক কর্মকর্তা বুনিয়ারিত নাইপাওয়ানি বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই এ ঐতিহ্য চালু রয়েছে। যখনই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দল সেমিনার বা কাজের জন্য এখানে আসেন, তখন তাঁদের আপ্যায়নের একটি প্রথা রয়েছে।

যার মানে তাঁদের ভালো খাবার খাওয়ানোর পর “মাদুর বিছিয়ে দাও”—যার অর্থ তাঁদের জন্য মেয়ে সরবরাহ করো।’ তিনি বলেন, ‘তাঁরা কী ধরনের মেয়ে পছন্দ করেন, কখনো কখনো সে ব্যাপারে আগে থেকেই আমরা তথ্য পেতাম। কখনো কখনো কর্মকর্তাদের জন্য ৫ থেকে ১০ জন মেয়েকে আনা হতো, যাতে তাঁরা বেছে নিতে পারেন।’

বুনিয়ারিত এই চর্চার বিষয়ে এখন খোলামেলা কথা বলতে পারছেন। এর আগে তিনি তা বলতে পারতেন না। মায়ে অং সোন প্রদেশে যৌনপল্লির নেটওয়ার্কগুলো পুলিশ দ্বারা পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দারা এ অভিযোগের ৪১টি মামলার তদন্ত করছে।

সম্প্রতি পাচারের শিকার এক কিশোরীর মা ব্যাংককে পালিয়ে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়ে এবং অন্য তিন কিশোরীকে প্রতারণার মাধ্যমে যৌনকর্মী বানানো হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের সঙ্গে যৌনকর্মে তাঁদের বাধ্য করা হচ্ছে। ওই নারী এ ঘটনা ফাঁস করার পরই গোয়েন্দারা এর তদন্ত শুরু করেন।

ওই নারী ঘটনাটি ফাঁস করার পর গণমাধ্যমের চাপের মুখে মেয়েদের পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির জাতীয় পুলিশ মায়ে অং সোনের পুলিশ সার্জেন্টকে গ্রেপ্তার করে। পাশাপাশি অন্য আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ছাড়া মায়ে অং সোনে সরকারি এক পরিদর্শনের সময় সরকারি তহবিল ব্যবহার করে মেয়েদের ভাড়া করে আনার অভিযোগে ননথাবুড়ি প্রদেশের পাঁচজন প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

মায়ে অং সোনের কর্মকর্তা বুনিয়ারিত নিপাভানিত বলেন, ‘ওই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর আঞ্চলিক অনেক কর্মকর্তা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন এই ভেবে যে তাঁদের আর এসব কাজ করতে হবে না।’

তবে, তথাকথিত এই ঐতিহ্যটি শুধু মায়ে অং সোনেই চালু নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংস্কৃতি দেশজুড়েই বিস্তৃত। এখানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই অধস্তনেরা চাকরি ধরে রাখার জন্য বা পদোন্নতির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোষামোদ করে থাকেন। কলাম লেখিকা লাখানা পানউইচাই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমাদের আমলাতন্ত্রে মেধার কোনো স্থান নেই। আমাদের বসদের ঘুষ দিতে হয়।’

লাখানা পানউইচাই বলেন, এই সংস্কৃতিতে মেয়েদের পণ্য হিসেবে দেখা হয়, মানুষ হিসেবে নয়। আর এই মানসিকতা থেকেই ঊর্ধ্বতনদের যৌনতার ব্যবস্থা করে দেওয়া চর্চার উৎপত্তি। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা এখানে সুন্দর পোশাক বা খাবারে মতো।’
প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যৌন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করায় পাচারের শিকার হওয়া মেয়ে ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন।

বিশেষ করে মায়ে অং সোনের মতো এলাকা, যেখানে সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা খুবই সংকীর্ণ, সেখানে এসব পরিবার মুখ খোলার সাহস পায় না। নিজেদের রক্ষা করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষও থাকে চাপের মুখে।

মায়ে অং সোন থেকে পালিয়ে ব্যাংককে গিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস করা ওই মায়ের অভিযোগগুলোকেও প্রাথমিকভাবে কবর দেওয়ার চেষ্টা করেছিল পুলিশ। ওই নারী বর্তমানে ব্যাংককে সরকারি নিরাপত্তায় রয়েছেন। তাঁর আইনজীবী এএফপিকে জানিয়েছেন, স্থানীয় কয়েকজন পুলিশ ওই নারীকে বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

মা অং সোনের ওই কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে থাইল্যান্ডের সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী বলেন, তারা ‘খাবারের জন্য মাদুর বিছিয়ে দাও’—এই চর্চার বিরুদ্ধে কাজ করে যাবে। দেশটির অ্যান্টি-ট্রাফিকিং পুলিশও যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

তবে, বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানে যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় সীমিত আকারে। নারী পাচারের বিরুদ্ধে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা রনাসিত রোয়েকসায়াজিউয়া বলেন, ‘পুলিশ কোনো যৌনকর্মীকে উদ্ধারের পর কখনোই ঘটনাটি আর বাড়তে দেয় না। যৌনকর্মীদের খদ্দের কারা, সে বিষয়ে তারা কখনোই তদন্ত করে না।’

সূত্র : এএফপি