বুধবার ২২ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ১০:৩২ am
তিন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা
রবিবার ২০ আগস্ট ২০১৭ , ৪:০৫ pm
পুঁজিবাজারে.jpg

প্রহরনিউজ, অর্থনীতি: দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে আসতে শুরু করেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে, বিনিয়োগও বাড়ছে। বাড়ছে বাজারের লেনদেন এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার দর। পুঁজিবাজারের প্রতি সকল পক্ষকে বেশ মনোযোগী হতে দেখা যায়।

কিন্তু কয়েকদিন ধরে হঠাৎ বাজারে টালমাটাল অবস্থা দেখা দিয়েছে। বাজারের গতিবিধি ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা বুঝে উঠতে পারছেন না। সূচক বাড়ছেতো লেনদেন কমছে, আবার লেনদেন বাড়ছেতো সূচক কমছে। বিনিয়োগকারীরা অনাহুত বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। বাজারের এরকম অস্থির আচরণে কিছুটা দু:চিন্তায়ও তারা। তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বাজার নিয়ে দু:চিন্তার কোন কারণ নেই। তাঁদের মতে, পুঁজিবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। তাহলে বাজার স্বাভাবিকভাবে বাড়বে, সংশোধন হবে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছুদিন যাবত আর্থিক বছর শেষ না হলেও হঠাৎ করে ব্যাংক খাতের শেয়ারের দর বাড়ছে। যেসব ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে সেগুলোরও দর বাড়ছে। আবার যেসব ব্যাংকের মুনাফা কমেছে, সেগুলোর দরও বাড়ছে। এমনকি যে ব্যাংকটি ক্রমাগত লোকসানে রয়েছে, সেটির দরও বাড়ছে। ফলে সূচক, লেনদেন ও বাজার মূলধন রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। আবার ব্যাংক খাতের সংশোধন হলেই বাজারে আতঙ্ক দেখা দেয়। এতে দেখা যায়, বাজার ক্রমাগত একটি নির্দিষ্ট খাতনির্ভর হয়ে পড়ছে। এটি ইতিবাচক বাজারের জন্য সুখকর নয় বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে কখনোই বাজার অগ্রসর হতে পারবে না। ভালো বাজারের জন্য ব্যাংক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতকেও এগিয়ে নিতে হবে। অন্যদিকে বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ার ফ্লো বাড়ানোর শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।

এটা সত্য যে, একটি খাতের ওপর নির্ভর করে কখনোই বাজার অগ্রসর হতে পারে না। তাছাড়া সূচক কিন্তু মার্কেটের প্রতিফলন নয়। এটি একটি নির্দেশক, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, বাজার কোন দিকে যাচ্ছে। আর বাজারের সূচককে জোর করে ছয় হাজারে নিতে হবে এমনও কোনো কথা নেই। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সূচক ছয় হাজার বা তার চেয়েও বেশি অতিক্রম করবে বলেও মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্রয়সীমার বাইরে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত পরিমাণ শেয়ার বাজারে না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, বাজারে মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই বহুজাতিক বা বহুজাতিক মালিকানাধীন। কিন্তু কোম্পানিগুলো শেয়ারের চাহিদার তুলনায় জোগান নিতান্তই কম হওয়ায় বাজারে এক ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ বিষয় জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ারবার্তাকে বলেন, বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কারণ কৃত্রিমভাবে বাজার বাড়ানো হলে তা টেকসই হয় না। বিএসইসিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। বাজারে কোনো অনিয়ম হলে তা চিহ্নিত করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে তিনি মনে করেন।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তারল্য ও আস্থার সংকট কোনটা নেই বলে মনে করছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান পরিচালক রকিবুর রহমান। তিনি বলেন, বাজার অচিরেই স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসবে। তিনি বলেন, ঈদ পরবর্তী বাজারে লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। বর্তমান বাজার নিয়ে সরকারসহ নীতি নির্ধারকরা নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ায় বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পথে এগুচ্ছে। এরই মধ্যে একটি চক্র বাজারকে অস্থিতিশীলকে করতে কাজ করছে। এই চক্রটি কখনো পুঁজিবাজার ভাল চায় না। এই চক্রটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দমন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

বাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত লেনদেন বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ গত চার কার্যদিবস ধরে বাজার একটা নিদিষ্ট গতিতে চলছে। এ গতি ধরে রাখতে পারলে বাজার স্বাভাবিক হবে। মূলত একশ্রেণীর বিনিয়োগকারীর স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগের কারণেই কিছুটা আস্থার অভাব বিরাজ করছে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে গত কয়েক কার্যদিবস ধরে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে বাজার এগুতে শুরু করলেও লেনদেন একদিন বাড়লে তিনদিন কমছে। সুচকের সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনের গতি বাড়তে থাকলে বাজার দ্রুত এগোবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, একশ্রেণীর স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারী আছে যারা বারবার উর্ধমুখী বাজারের সুবিধা নিয়েছে। আবার সুযোগ বুঝে শেয়ার বিক্রি করে নিস্ক্রিয়ও হয়ে গেছে। এ ধরনের স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের কারনেই বাজারে স্বাভাবিক আচরণ স্থায়ী হচ্ছে না। আর যেহেতু বাজার স্বাভাবিক না হলেও তাদের মুনাফায় ঘাটতি পড়ছে না, তাই ইচ্ছে করেই তারা বাজারকে নিম্নমুখী প্রবণতায় রাখতে চাচ্ছে কোন একটি পক্ষ। আর এতে করে বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা চিড় ধরেছে।

এদিকে ২০১০ সালের ধস পরবর্তী সময়ে কয়েকবার বাজারে উত্থান প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এ উত্থান প্রবণতা দেখে বিনিয়োগকারীরা প্রতিবারই লোকসান কাটনোর প্রত্যাশা করেছেন। অনেকে নতুন করে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের লোকসান কাটানোর চেষ্টাও করেছেন; কিন্তু কিছুদিন বাজার স্থিতিশীলতার আভাস দিয়ে আবারও পতনে রুপ নিচ্ছে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়ছে। এ ধরণের পরিস্থিতিতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমার পাশাপাশি কমছে আস্থা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখাটা খুবই জরুরী। এজন্য বাজারের অনিয়ম দুর করতে হবে, বহুজাতিক কোম্পানিসহ অন্যান্য খাতে মৌলভিত্তির শেয়ারের যোগান বাড়াতে হবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠান মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।