সোমবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ৬:৪১ am
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে সুচির প্রতি মালালার আহ্বান
সোমবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৪:৪৭ pm
Malala-sucy_576x410.png

প্রহরনিউজ, আন্তর্জাতিক: নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই  সু’চিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি’র যথাযথ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছেন তিনি। রাখাইনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সহিসংতা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষাবঞ্চিত নারীদের অধিকারের পক্ষে সরব মালালা। আগেও তিনি রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।

সাম্প্রতিক ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের লক্ষ্যে সেনা অভিযান শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গা’রা ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালায়। সেই সংঘর্ষে রোহিঙ্গা-পুলিশ-সেনাসদস্য মিলে অন্তত ১০৪ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়ে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান জোরদার করে সরকার। তারপরের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসছে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশছে মৌসুমী বাতাসে। সেই ধোঁয়া মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠা রাখাইনের আকাশকে করে তুলছে বিবর্ণ ধূসর। রোহিঙ্গা জীবনে আরও বেশি ধূসরতা। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ছেন সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হচ্ছে তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে মানুষকে।

মালালা রাখাইন পরিস্থিতিকে হৃদয়বিদারক এবং নিন্দনীয় উল্লেখ করে সু’চিকে এ ঘটনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তাগিদ দেন। বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমি বারবার তাদের [রোহিঙ্গাদের] বিরুদ্ধে অমানবিক ও নিন্দনীয় ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে আসছি।’ তিনি লিখেছেন, ‘সু চির কাছেও আমি একই ভূমিকা প্রত্যাশা করি। বিশ্ব তার যথাযথ পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে। অপেক্ষায় রয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা।’

জাতিসংঘ মিয়ানমারের অসহযোগিতা আর বাধার কারণে রাখাইনে ত্রাণ সরবরাহ স্থগিত করেছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। পরিস্থিতিকে জাতিসংঘ দেখছে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে।  মানবতাবিরোধী অপরাধের  অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অভিমত, মিয়ানমার আদতে রোহিঙ্গাদের পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পৃথক পৃথক প্রতিবেদনে উঠে আসছে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’র করুণ আখ্যান। মালালা বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এই সহিংসতা বন্ধ কর। আমাদের আজ ছবিতে দেখতে হচ্ছে সেইসব ছোট্ট ছোট্ট শিশুকে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যাদেরকে হত্যা করেছে। এই শিশুরাতো কাউকে হামলা করেনি, তা সত্ত্বেও আগুনে তাদের ঘর পুড়ছে।’

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের আলাদা কোনও জাতিগোষ্ঠীই মনে করা হয় না। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত ওই জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে দায়িত্ব অস্বীকার করতে চায়। তবে রোহিঙ্গারা নিজেদের মিয়ানমারের নাগরিক বলেই জানে। নাগরিকত্বকে তারা অধিকার হিসেবেই দেখে।মিয়ানমার সরকারকে মালালা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতের তাগিদ দেন। বলেন, যে মিয়ানমারে প্রজন্মের পর প্রজন্মান্তরে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন, সেটা তাদের দেশ না হলে রোহিঙ্গাদের দেশ তবে কোনটা? রোহিঙ্গাদের জন্ম মিয়ানমারে, তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা সে দেশের সরকারেরই দায়িত্ব।’

এরআগে ২০১৫ সালেও মালালা এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ এবং তাদের নাগরিকতা নিশ্চিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর রাখাইন রাজ্যে বড় আকারের সামরিক অভিযান হয়েছিল। তখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সামিল বলে উল্লেখ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা স্যাটেলাইট ইমেজ প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাখাইনের দমনপীড়ন ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার তথ্য হাজির করে। তবে মিয়ানমার ওইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে শুরু থেকেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কফি আনানের নেত্বত্বে আলাদা তদন্ত কমিশন গঠন করে তারা। সেই তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের একদিনের মাথায় নতুন করে হামলা ও সংঘর্ষ শুরু হয় বৃহস্পতিবার থেকে। শুক্রবার থেকে বেসামরিক রোহিঙ্গাদোএর ওপর সেনানিপীড়নের খবর সামনে আসতে শুরু করে।

মিয়ানমারএর ডি-ফ্যাক্টো সরকারের আমন্ত্রণেই রাখাইন পরিস্থিতি তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছিল কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সেই তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও সংখ্যার বিচারে রোহিঙ্গাদেরকে‘বিশ্বের সবথেকে বড় রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায়’ হিসেবে অভিহিত করে নাগরিকতা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়। প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয় আরোপিত সমস্ত বিধিনিষেধ। এতে সতর্ক করা হয়, স্থানীয় জনগনের বৈধ অভিযোগ উপেক্ষিত হলে তারা জঙ্গিবাদে ঝুঁকতে পারে।