বৃহস্পতিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ৯:৪৮ pm
নো-ম্যানস ল্যান্ডের রোহিঙ্গারা যায় কোথায়?
মঙ্গলবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ১:৪৪ am
নো-ম্যানস ল্যান্ডের রোহিঙ্গা

প্রহরনিউজ, প্রবাস : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংস ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল নেমেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে। আবার অনেকে অনুপ্রবেশের সময় দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের বাধার মুখে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন। এ কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েন। পরে এসব রোহিঙ্গাকে স্বদেশে (বিজিবির ভাষায় প্রতিহত করা) ফেরত পাঠানো হয়। বিজিবির পাশাপাশি জলসীমানায় দায়িত্বরত কোস্টগার্ড ও পুলিশসহ নানা সংস্থার লোকজনও একইভাবে বিজিবির সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠায়।

ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা কি আসলেই মিয়ানমারে ফিরে যাচ্ছে? নাকি সীমান্তের অন্য পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ফের অনুপ্রবেশ করছে? নো-ম্যানস ল্যান্ডে ২/৪ দিন অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গারা যায় কোথায়? অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে রোহিঙ্গাদের প্রথমে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে রাখে বিজিবি। পরে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তবে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা যায়, একবার মিয়ানমার ছাড়ার পর রোহিঙ্গাদের কেউই আর দেশটিতে ফেরত যায় না। বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর তৎপরতা সত্বেও নানা কৌশলে তারা আবারও বাংলাদেশেঅনুপ্রবেশ করে।

এ বিষয়ে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জেলা প্রশাসনের মুখপাত্র ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যারা নো-ম্যানস ল্যান্ডে রয়েছে, তারা এখনও সে জায়গায় আছে। তাদের অনুপ্রবেশ করার সুযোগ দেয়নি বিজিবি। বর্তমানেও ২০-২২ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের তথ্য– ৯০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও সীমান্তে দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী এই পর্যন্ত ৭৮ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।’

সীমান্তে বসবাসরত স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলায় বিজিবির সদস্যরা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের প্রতিহত করে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করায়। কিন্তু পরে রাতের আঁধারে এই রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে। একইভাবে স্বদেশে ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারাও সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির কড়া নজরদারি এড়িয়ে ফের অনুপ্রবেশ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন গুরা মিয়া (৭০)। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নাইক্ষ্যংছড়ি তুমব্রু সীমান্তের জলপাইতলী নো-ম্যানস ল্যান্ডে দুই দিন অবস্থান নেওয়ার পর কুতুপালং ক্যাম্পে ঢুকেছেন। তার সঙ্গে দুই পরিবারের ১৮ জন সদস্য রয়েছেন। গত রবিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) রাতেই তারা কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছেন বিনা বাধায়।’ একইভাবে উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মেহেরুন্নেছা (৫৫), মোহাম্মদ আলম (২৮), জানে আলম (৩৫), আয়েশা বেগম (২৫) ও নুরুল ইসলামসহ অনেকেই নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়ার পর ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা বলছেন, শত শত রোহিঙ্গা নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনকে ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পে আসছেন। একইভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা সীমান্ত পয়েন্ট বদলে অন্য পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশে চলে আসছে।

অনুপ্রবেশকারী এই রোহিঙ্গাদের ভাষ্য মতে, মিয়ানমারে ফেরত গিয়ে অমুসলিমদের হাতে মৃত্যু হওয়ার চেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে মুসলিমদের হাতে মৃত্যুবরণ করা অনেক শ্রেয় বলে মনে করেন রোহিঙ্গারা। এ কারণে অনেকটা অনিশ্চিত গন্তব্য জেনেও দলে দলে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নিচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে। ক্যাম্পে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় রাস্তাঘাট, দোকানপাট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা।

গত ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্য ও বহু রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এ ঘটনার জেরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোসহ নানা নির্যাতন চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। এ কারণে প্রতিদিন পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসছেন অসংখ্য রোহিঙ্গা।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৯০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এছাড়াও নাফ নদীর জলসীমানা থেকে শুরু করে স্থলসীমানা পার হয়ে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইনে একইভাবে দমন-পীড়ন চালায় সেনাবাহিনী। এসময় প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। তারা এখনও কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে ও এর বাইরে বাস করছে। বাংলা ট্রিবিউন