শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ১২:৪৭ am
রোহিঙ্গা নিশ্চিহ্নে : মিয়ানমার সেনারা দিনে সান্ত্বনা, গভীর রাতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা
রবিবার ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ১:১৬ pm
Myanmar army.jpg

প্রহরনিউজ, প্রবাস: মিয়ানমারের সেনা বাহিনী দিনের বেলা সবাইকে ডেকে বাড়িতে থাকতে বলে। আর কোনও সমস্যা হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়। ‍কিন্তু এরপর গভীর রাতে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে ও গুলি ছুড়ে মানুষ হত্যা করে তারা। রাখাইনের প্রতিটি গ্রাম রোহিঙ্গামুক্ত করতে নতুন এই কৌশল নিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

শনিবার শেষবারের মতো গ্রামছাড়া হওয়া মানুষগুলো এমন তথ্যই জানিয়েছেন। নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা এই বিপন্ন মানুষেরা জানান, সেনাবাহিনীর সদস্যরা এলাকার চেয়ারম্যানদের ডেকে নিয়ে সবাইকে বাড়িতে থাকতে বলে। এরপর গভীর রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় তারা। আগুনে পুড়তে থাকা বাড়ি থেকে বের হয়ে রোহিঙ্গারা যখন অন্ধকারে ছোটাছুটি করেন, তখন তারা গুলি ছুড়ে হত্যা করে।

শনিবার সকাল ১১ টায় টেকনাফের লম্বাবিল থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন জাফর আলম (৪০)। তার বাবার নাম জাকির হোসেন। জাফর আলম মংডুর মরিকং এলাকার চেয়ারম্যান। টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় বসে কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমি দশ বছর ধরে এলাকার চেয়ারম্যান। মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সঙ্গে আমার প্রতিদিন কথা হতো। আমার মোবাইল নম্বর তাদের কাছে ছিল। তারা আমাকে ফোন দিয়ে ডাকতো। আমি গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতাম। যেকোনও বিষয়ে তাদের নির্দেশনা থাকলে আমাকে দিয়ে তা এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতো। আমি সেই অনুযায়ী সবাইকে চলাফেরা করতে বলতাম। প্রতিমাসের ৮ ও ১৬ তারিখ প্রতিটি এলাকার চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মংডুতে তারা বৈঠক করতো।’

জাফর আলম বলেন, ‘‘গত ৫ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ বিজিপি’র বড় অফিসার আমাকে ডেকে নিয়ে যায়। আমাকে বলে, ‘আর কোনও সমস্যা নেই। এখন তোমরা সবাই বাড়িতে থাকো। আর কোনও ঝামেলা হবে না। ঝামেলা হলে হট লাইন ৫৫২ অথবা আমার মোবাইল নম্বরে ফোন দেবা। তোমরা কেউ বাংলাদেশে যাবা না।’ রাত ৯টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে তার কথা হয়। এসময় মরিকং এলাকায় যে বিজিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করেন, তিনিও সঙ্গে ছিলেন। কথা বলে আমি রাত ৯ টার দিকে বাড়িতে আসি। এরপর রাত ১২টার দিকে শুনি, পাশের গ্রামে আগুন দিয়েছে। তখন আমরা সবাই বাসা থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারে প্রতিবছর প্রতিটি ঘরের সদস্যদের গণনা করা হয়। ছবি তোলা হয়। পরের বছর সেই ছবির সঙ্গে বর্তমান বছরের সদস্যদের মেলানো হয়। ওই সময় কোনও বাড়তি সদস্য দেখলেই তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি গণনার সময় কেউ ঘরের বাইরে থাকলে, তাদেরও খুঁজে বের করে আনতে হয়। তা না হলে পুরো পরিবারকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের (সেনাবাহিনী) সন্দেহ, ছেলেরা বড় হলেই সন্ত্রাসী হবে।’

চেয়ারম্যান জাফর আলমরা সাত ভাইবোন। তার স্ত্রীর নাম জোহরা বিবি (৩০)। তার চার সন্তান। তিন ছেলে ও এক মেয়ে। পরিবারসহ এতদিন পর বাংলাদেশে আসার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আগে চলে আসলে, আমার পেছনে পেছনে এলাকার সবাই চলে আসতো।  আমি এলাকার চেয়ারম্যান হয়ে আগে চলে আসলে,সবাই ভয় পেতো। তাই আমি ঝুঁকি নিয়ে সেখানিই ছিলাম। এতদিন যারা দূর থেকে এসেছে, আমার বাড়িতে তাদের রেখে ৪৩টি গরু জবাই দিয়ে খাওয়াইছি। সীমান্তে আসার সময়ও তাদের খাবার দিয়ে দিছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার ১০৫ কানি জায়গা। দু’টি চিংড়ির ঘের। বাড়িতে সব আছে। বলিয়াবাজার এলাকায় একটি পাকা বাড়ি আছে। সব রেখে চলে এসেছি।’

ইউপি চেয়ারম্যান জাফর আলমের বাবার নাম জাকির হোসেন। দাদার নাম মিয়া হোসেন। তার পূর্বপুরুষ সবাই রাখাইনের বাসিন্দা। তিনি তার বাড়িঘরের ছবি দেখান, আর কান্নায় ভেঙে পরেন।

‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী স্বাভাবিক সময়েও আমাদের এলাকায় প্রতিদিন দুই শিফটে ২০ জন করে টহল দেয়। এ ঘটনার পর এখন তাদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আকাশে হেলিকপ্টারেও টহল দেয়।’ জাফর বলেন।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের পত্রিকাগুলো সব মিথ্যা কথা লেখে। তারা যে সন্ত্রাসী হামলার কথা বলেছে, আমরা সেই হামলার কিছুই দেখিনি। হামলা যারা করেছে, তাদের তারা গ্রেফতার করুক। আমরা কী করছি। রাখাইন ছাড়া অন্য রাজ্যে যখন কোনও সেনাবাহিনীর সদস্য মারা যায়, তখন কি সেই রাজ্যের সবাইকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়?’

রাখাইন রাজ্যে কোনও বহিরাগত প্রবেশ করে না, উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনও আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসলেই তাদেরও সন্ত্রাসী বলে তারা। এজন্য কেউ কারো বাড়িতে যায় না। তাহলে চারটা অভিযোগে মামলা দেয়। সন্ত্রাসীকে খাবার দেওয়া, জায়গা দেওয়া, টাকা পয়সা দেওয়া ও খবর দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তাদের ধরে নিয়ে জেলখানায় রাখে।’

বর্তমানে এলাকার ১২ জন চেয়ারম্যান কারাগারে আছেন বলেও তিনি জানান। চেয়ারম্যান জাফর আলম তার পরিবার নিয়ে টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। দেশে আর ফিরে যেতে পারেন কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তার ।

গত ২৫ অক্টোবার থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসা শুরু করে রোহিঙ্গারা। এর আগে গত ২৪ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ করেন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। প্রতিদিনই কোনও না কোনও গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। এই সহিংসতা থামার কোনও লক্ষণ নেই। ২৫ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিনই ঢুকছেন নিঃস্ব হয়ে আসা রোহিঙ্গারা।