মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ১২:৫৫ pm
রোহিঙ্গা ইস্যু : দিল্লির বিরুদ্ধে মমতার বিদ্রোহ
রবিবার ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ২:০৩ pm
rohingya-_2.jpg

প্রহরনিউজ, ভারত: মিয়ানমার থেকে উৎখাত হওয়া যে সব রোহিঙ্গা মুসলিম ভারতে ঢুকেছেন, তাদের ‘পুশব্যাক’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। রাজ্যগুলোকে এই নীতি মেনে চলতে বলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই ফরমান মানতে নারাজ পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির সরকার। রাজ্যের সচিবালয় নবান্নের শীর্ষ মহলের সিদ্ধান্ত, উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা এ রাজ্যে থাকতে চাইলে মানবিকতার খাতিরেই তাদের থাকতে দেয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘‘রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই কেন্দ্র এমন অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্র অমানবিক হলেও আমরা তা হতে পারব না।’’

মিয়ানমারে সন্ত্রাসের শিকার হয়ে গত কয়েক বছর ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সে দেশ ছেড়ে নৌকা করে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। গত ২৫ অগস্ট থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ায় সেই সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে ইতিমধ্যেই আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার জম্মু লাগোয়া এলাকায় রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি মিয়নমারে গিয়ে এদের সকলকে ‘পুশব্যাক’ করার নীতি ঘোষণা করে এসেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তেমন নয়। বনগাঁ-বসিরহাট সীমান্ত এবং উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকা দিয়ে কিছু রোহিঙ্গা পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যে ঢুকেছেন। ধরা পড়ার পরে তাদের অনেকেই এখন জেলে। অসম-দাঙ্গার পর উত্তরবঙ্গেও বেশ কিছু রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এদের কাউকেই ‘পুশব্যাক’ করা হবে না বলে সরকারি স্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যদিও কেন্দ্রের চাপে এ রাজ্যের বিভিন্ন হোমে বন্দি থাকা ২৩ জন মহিলা ও শিশুর পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইউনাইটেড নেশন হাইকমিশন ফর রিফিউজিস রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র দিচ্ছে। এ রাজ্যের হোমে বন্দিদেরও তেমন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজ্যের মুখ্যসচিব মলয়কুমার দে-কে ধমক দিয়ে সেই পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ করিয়েছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকায় বলা হয়েছে, ভারতে ১ লাখ ২০ হাজার তিব্বতি, ৬০ হাজার পাখতুন, ১০ হাজার সিংহলি শরণার্থী রয়েছেন। এর পাশাপাশি, ৩০ লাখ থেকে ২ কোটি বাংলাদেশীও ঢুকে পড়েছেন বলে বিভিন্ন সংস্থার দাবি। কেন্দ্র কখনো এদের নিয়ে বিশেষ অবস্থান নেয়নি। অথচ, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপরে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্বিচার হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বহু দেশ তাদের জন্য দরজা খুলে দিলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘‘সব রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুই অনুপ্রবেশকারী। তাদের সকলকে ফেরত পাঠানো হবে।’’

রিজেজুর মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে জাতিসঙ্ঘ। যার উত্তরে রিজিজু আবার বলেছেন, ‘‘গোটা বিশ্বে ভারতেই সব চেয়ে বেশি উদ্বাস্তুর বাস। অতএব উদ্বাস্তু সমস্যা ও তা সামলানোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের জ্ঞান দেয়ার দরকার নেই।’’

এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ‘পুশব্যাক’ করা এবং না করার সিদ্ধান্ত— দুয়ের পিছনেই রাজনীতির ছাপ দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, হিন্দুত্বের রাজনীতি তুলে ধরতেই ‘পুশব্যাক’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। অন্য দিকে বাঙালি মুসলিমদের ‘পুশব্যাক’ না করে লাভের অঙ্ক কষছে তৃণমূল।

বস্তুত, এ নিয়ে রাজনৈতিক ইতিমধ্যেই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর কটাক্ষ, ‘‘যার মাথায় তোষণ ছাড়া আর কিছু নেই, তিনি তো রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাবেনই। কিন্তু এর পরে যদি হাজার হাজার রোহিঙ্গা এ রাজ্যে ঢুকতে শুরু করে, মুখ্যমন্ত্রী সামলাতে পারবেন তো?’’ যার উত্তরে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দেশের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক। একটা মানবিক সরকারের পক্ষে যা করা উচিত, আমরা সেটাই করছি।’’

আনন্দবাজার পত্রিকা পত্রিকায় বলা হয়, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে শনিবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করলেন নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলি। বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সমস্যা মানবিক ভাবে নিরসনের জন্য মায়ানমারের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে ঢাকা। সূত্রের খবর, শুধু ভারত নয়, এগিয়ে আসার জন্য সমস্ত রাষ্ট্রের কাছেই এই আবেদন জানানো হচ্ছে।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মিয়ানমারে পাঠাতে মরিয়া নয়াদিল্লিও। রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হামলার বিরোধিতা করে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ালেও সাম্প্রতিক মায়ানমার সফরে নরেন্দ্র মোদি এই উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে সে দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন। মনে করা হচ্ছে, এ বার বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলায় উদ্যোগী হল নয়াদিল্লি।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের ছাড় দেবে না কেন্দ্র, দাবি নাকভির

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোনো রকম ছাড় দেয়া কঠিন বলে জানালেন সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি। শনিবার তিনি জানান, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় সরকারও গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। মিয়ানমারই যখন রোহিঙ্গা মুসলিমদের রাখতে চাইছে না, তখন ভারতের পক্ষেও তাদের কোনো রকম ছাড় দেয়া সম্ভব নয় বলেও জানান নাকভি। মিয়ানমার থেকে বেআইনিভাবে আসা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সেদেশে ফেরত পাঠানো হবে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত ৪ সেপ্টেম্বর শীর্ষ আদালতে একটি মামলা করা হয়।

আগামী ১১ সেপ্টেম্বর এই মামলার শুনানি হবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। গত মঙ্গলবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, রোহিঙ্গা মুসলিমরা বেআইনি উদ্বাস্তু। তাদের ফেরত পাঠানো উচিত। এর আগেও রোহিঙ্গা মুলসিমদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময়ে অনেকেই জম্মু, হায়দরাবাদ, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, রাজস্থানে চলে আসেন।