মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ৬:৪৬ pm
নান্দনিক সৌন্দর্যের বেলাভূমি সাগরকন্যা কুয়াকাটা
রবিবার ১ অক্টোবর ২০১৭ , ৮:২৫ pm
কুয়াকাটা.jpg

রাজু আহমেদ
ঢাকা: এখানে কতিপয় সতর্কতা এবং কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু পরামর্শ সাপেক্ষে নিরপেক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা!
ইট-পাথরের বন্দি জীবন যখন রস-কষহীন লাগে, শহরের যান্ত্রিক জীবনের গতির সাথে তাল মেলাতে মেলাতে যখন জীবনের ওপর বিরক্তি ঠেকে, রোজকার গতানুগতিক জীবনের সাথে সংগ্রাম করতে করতে যখন ক্লান্তি অনুভব করেন তখন একা নতুবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিংবা সবান্ধব কিছুদিনের জন্য ঘুরে যেতে পারেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমূদ্র সৈকত তথা সাগরকন্যা কুয়াকাটায় । ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ দিতে প্রকৃতি এখানে উদার হয়ে তার রূপ-লাবণ্যের সবটাই অবারিত করে রেখেছে । শরীর এবং মনের সুস্থতার জন্য কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন এবং নির্মল বায়ু সকল ক্লান্তি-অবসাদ দূর করে আগতকে আনন্দ দিবেই । সৈকতের এমাথায় সূর্যদয় এবং ওমাথায় সূর্যাস্ত দর্শনের অভিজ্ঞতা ভ্রমনকারীকে নব আনন্দে মাতাবে । এছাড়া কতিপয় ঐতিহাসিক স্থানের দর্শন আপনাকে ইতিহাসের সাথে পরিচায় করিয়ে দেবে । তবে সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, সমুদ্রস্নান । আপনি সাতার জানেন কিংবা না জানেন, ভীত কিংবা সাহসী, বারণ কিংবা শাসন-কোন কিছুই আপানে সমুদ্রে নামা থেকে বিরত রাখতে পারবে না । দূর সমূদ্র থেকে ভেসে আঁকাবুঁকি হয়ে  উঁচু উঁচু ঢেউ যখন পাড়ে আঁছড়ে পড়ার একটু আগে তার ওপর ঝাঁপানোর মজাই আলাদা । সমুদ্রের একবার নামলে ঢেউয়ের সাথে খেলতে খেলতে এতোটা মজে যাওয়া হয়, আর উঠতেই ইচ্ছা করে না ।

গমনেচ্ছুকদের জন্য কতিপয় সতর্কতা
কুয়াকাটার ভ্রমনকে আপনি কোনভাবেই নিরানন্দের হিসেবে উল্লেখ করতে পারবেন না যদি কতিপয় ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করেন । নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো স্মরণে নিয়ে ভ্রমন করলে আপনার আনন্দ অম্লান থাকবে । এ পরামর্শ শুধু কুয়াকাটা ভ্রমনের জন্যই নয় বরং দেশের যতগুলো ভ্রমনের জায়গা রয়েছে প্রায় প্রত্যেকটির জন্য এসব কাজে আসবে ।

 ০. শুরুতেই মনে রাখবেন, এখানে যারা বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের প্রত্যেকেই বেশ ভালো আকৃতির একেকটি বাঁশ নিয়ে ঘোরাফেরা করছে । সুযোগ পেলেই আপনাকে বোকা বানিয়ে আনন্দটুকু শেষ করে দিবে । ভাববেন না, এরা চোর-গুন্ডা । এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক । তবে আপনাকে বিব্রতিতে ফেলে ঠকাতে পারে হোটেলওয়ালা থেকে শুরু করে সৈকতের ফটোগ্রাফার পর্যন্ত । মোটরবাইকওয়ালা থেকে দোকানীদের সবাই তো ঠকানোর জন্য বসে  আছে । আপনার সাথে এরা এমনভাবে কথা বলবে, আপনি এদের ঋষীগোচের কেউ ভেবে বসলেই সর্বনাশ । আপনাকে বারে বারে ধোঁকা দিয়ে পটেক ফাঁকা করে দিবে । কাজেই যাচাই-বাচাই তো বেশ ভালোভাবেই করবেন ।

  ১. গোসলের সময় সাবধান থাকবেন । বিশেষ করে স্ত্রী-বোন-কন্যা কিংবা অন্য কোন নারীদের নিয়ে সমূদ্রে নামার সময় বিশেষ সতর্ক থাকবে । এখানে বেড়াতে আসা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কিছু সংখ্যক কুলাঙ্গারের দেখা মেলে । যারা সুযোগ পেলেই অশালীন কিছু করে বসবে । আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যারা নিয়োজিত তারা পানি থেকে বেশ দূরে থাকে । কাজেই নিজের নিরাপত্তাটুকুর  ব্যবস্থা নিজেকেই গ্রহন করতে হবে । বিশাল বিশাল ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলানো মুশকিল । বদের দল এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় । আমি ( ২৭+২৮+২৯/০৯/২০১৭) কুয়াকাটায় ছিলাম এর মধ্যের দিন দু’জন মহিলা দর্শনার্থী অশালীনতার শিকার হয়েছে । এ অন্যায়ের  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার একজন আক্রান্তের স্বামীকে কুলাঙ্গারা প্রহার করে প্রায় বেঁহুশ করেছে । আরেকজনের স্বামীকে অনেকগুলো ঘুষি দিয়েছে । আমি এবং আমার বন্ধুরা অনেক কষ্ট করে তাদেরকে আগলে তীরে নিয়ে আসতে পেরেছি । তাতে আমাদের পিঠও একেবারে নিরামিষ যায়নি ! শুনেছি, এখানে কেউ আক্রান্ত হলে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে না এসে দাঁড়িয়ে তামশা দেখে । ফটোগ্রাফারদের কাছ থেকে জানলাম, তারা যদি কাউকে সাহায্য করতে যায় তবে উল্টো প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ওপর চাপ আসে । তবে সেদিন  ভাগ্যভালো, র্যা বের একজন ম্যাজিষ্ট্রেট সেখানে বেড়াতে গিয়েছিল । তার ভূমিকাতেই ঝামেলা অনেকটা কম হয়েছে  । তার চেষ্টার পরেও ওখানে নিয়োজিত যে টুরিষ্ট পুলিশ ছিল তাদের ভূমিকা সন্তোষজনক মনে হয়নি । যারা ওদিন মেয়েদের শরীরে হাত দিয়েছিল তারা চিহ্নিত হয়ে পাকড়াও হওয়ার পরেও শুনেছি তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে । কাজেই নিজের সাবধানতা তো একটু নিজেকেই রক্ষা করতে হবে ।

 ২. এখানে আপনাকে ঠকানোর জন্য যারা আছে তাদের মধ্যে ঐক্য বেশ দৃঢ় মনে হল । যদি একটু অসাবধান হন তবে আপনি বুঝে ওঠার আগেই সর্বনাশের ঘন্টা বাজিয়ে দিবে । ধরুণ, আপনি হোটেল এলাকা থেকে সূ্র্যদয় দেখতে যাবেন । মটরবাইকে এর জন্য আপনাকে শ’খানেক টাকা ভাড়া দিতে হবে । এরপর সেখান থেকে কুয়াকাটার পুর্বাঞ্চলের ৬টি দর্শনীয় স্থান দর্শনে যাওয়ার জন্য আপনাকে ওরা পীড়াপীড়ি শুরু করবে । যেহেতু ঘুরতে গেছেন এসব জায়গাতে আপনার যাওয়া উচিত । সত্যি সত্যিই এসব দেখার মত জায়গা । আমি যেহেতু বিশাল নদীরপাড়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েও সমুদ্রকন্যায় গিয়ে বারবার বিমোহিত হয়েছি সেহেতু আপনি সারাজীবনে বইপত্রের বাইরে নদীর না দেখায় আপনাকে এসব জায়গা তো প্রেমে ফেলবেই । এই সুযোগটাই ওরা হাতিয়ে নেবে ।  লালকাঁকড়ার চড়, বৌদ্ধ মন্দির, কুয়াকাটার কুয়ো-এসব জায়গায় যাওয়ার জন্য আপনার কাছে জনপ্রতি ৩৬৫ টাকা ভাড়া চাইবে । অথচ একটুক সাবধানতার সাথে দরদাম করে গেলে দু’জন একত্রে ২৫০-৩০০ টাকায় যেতে পারবেন ।  ভ্রমনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংখ্যার কোন শেষ নাই কিন্তু সর্বনিম্ন অন্তত দু’জন যাওয়া উচিত । তাহলে সুবিধা হয় ।

 ৩. কুয়াকাটায় হোটেল ভাড়া আহামরি বেশি নয় । আপনার রুচি ও সামর্থ্য মত প্রতিরাত ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকায় থাকতে পারেন । তবে মোটামুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর ও নিম্নশ্রেণীর হোটেগুলোতে ভাড়া চাওয়ার সময় কয়েকগুন বেশি চায় । কাজেই চুক্তির সময় একটু সবাধানতা অবলম্বন করুন । খাওয়ার ব্যাপারে ওই একই কথা । কুয়াকাটায় রান্নার মান যে খুব ভালো তা বলা যাবে না তবে আপনি ‍কিছু স্পেশাল খাদ্য খেতে নিতে পারেন । রুচি হলে, শুঁটকির ভর্তা, বিভিন্ন ধরণের ঝলসানো সামুদ্রিক মাছ ।

 ৪. ঘুরতে গেলে সেখানকার কিছু লোকজ জিনিসপত্র ক্রয় না করে পারা যায়না । তবে সাবধান না হলে দোকানীগুলো আপনাকে বেশ সম্মানের সাথে ঠকিয়ে দিতে পারে । মেয়েদেরকে নিয়ে কেনাকাটায় ঠকতে হয় বেশি । তখন দামাদামির ব্যাপারে লজ্জায় পরেও অনেক কিছু বলা যায়না । অথচ ওখানের দোকানীরা পণ্যের যে দাম তার চেয়ে ৩/৪ গুন দাম বেশি চায় । কাজেই সাবধান, নইলে ফিরে আসার ভাড়া ধার করতে হবে ।

 ৫. এখানের ব্যবসায়ীরা যদি বুঝতে পারে আপনি বরিশাল বিভাগের না তবে আপনাকে শুঁষে নিতে এরা ফাঁক খুজবে । কাজেই একটু চালাক হয়েই এখানে ঘুরবেন ।  

কর্তৃপক্ষের কাছে পরামর্শ
সমুদ্রকন্যা কূয়াকাটা আমাদের জাতীয় সম্পদ । আন্তর্জাতিক বিশ্বে যতগুলো সম্বল নিয়ে আপনার গর্ব করতে পারি তার মধ্যে কুয়াকাটা অন্যতম । ১৮ কি.মি দৈর্ঘ্যের এ সৈকতের প্রতিটি ইঞ্চি জুড়ে রয়েছে সম্ভাবনা । কাজেই হেলায়-ফেলায় যাতে আমাদের সম্পদ নষ্ট না হয় তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করি । বিশেষ কিছু দিকে দৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ রাখলাম । যথা-

 ১. বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটুকুর আরও উন্নতি দরকার । যদিও সিংহভাগ রাস্তা বেশ ভালোই তবে কয়েক কি.মি. রাস্তার সংস্কার আশু আবশ্যক । এছাড়াও কুয়াকাটার সৌন্দর্য নির্বিগে দর্শনের জন্য জন্য আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পথের ব্যাপক উন্নয়ণ দরকার ।

 ২. আবাসিক হোটেল, খাওয়ার হোটেলসহ বিভিন্ন দোকানপাট ও ভ্রমন মাধ্যমের ওপর আরও নজরদারি বাড়ানো আবশ্যক । কোন পর্যটককে যাতে কেউ ভোগান্তিতে না ফেলে তার জন্য প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি আবশ্যক । এখানকার সকল বিষয় নিয়ন্ত্রনের জন্য আলাদা নীতিমালা আবশ্যক । প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোকজ পণ্যগুলোর দরসূচি পর্যবেক্ষণের জন্য মনিটরিং দল গঠন করার আবশ্যক । যেখানে প্রশংসা, শাস্তি ও জরিমানার বিধান থাকবে । আকাশ-পাতাল দর হাঁকানোর নিয়ম বাতিল না করলে মুশকিল ।
...
 ২. সমূদ্রে অন্তত আধা কি.মি সৈকত স্বামীসহ স্ত্রী-সন্তান এবং শুধু মেয়েদের গোসলের জন্য নির্ধারণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবী । এতে পর্যটকদের সামগ্রিক নিরাপত্তার অর্ধেকটাই নিশ্চিত হবে ।
....
‘বিপুলা এ ভূবনের কতটুকু জানি’- প্রকৃতির কাছাকাছি আসুন । জীবনের মানে জানুন । জীবন যখন দুর্বিষহ ঠেকবে তখন চলে আসুন কুয়াকাটায় । কথা দিচ্ছি, সব ভুলে যাবেন, মন আবার নতুনভাবে জাগবে । ও হ্যা ! কুয়াকাটায় যেতে হলে আপনাকে বরিশালের বুকের ওপর দিয়েই যেতে হবে । আর আমি বরিশালের বুকের ওপরেই থাকি । আসা কিংবা যাওয়ার পথে এক কাপ চা নিশ্চয়ই খেতে যাবেন । সকল প্রকৃতিপ্রেমিকদের জন্য শুভ কামনা রইলো ।


লেখক : কলামিষ্ট
Fb.com/rajucolumnist