মঙ্গলবার ২৩ জানুয়ারী ২০১৮ || সময়- ২:৫৫ pm
পিরোজপুরে আমড়ার বাম্পার ফলন
শনিবার ৭ অক্টোবর ২০১৭ , ৮:৫৫ pm
পিরোজপুরে আমড়া.jpg

প্রহরনিউজ, কৃষি: উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরে এবার মৌসুমী ফল আমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না আমড়া। এতে করে চাষীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায় থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় বাগানেই লাখ লাখ টাকার আমড়া পচে নষ্ট হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ফেরিওয়ালারা ঘুরে ঘুরে আমড়ার ছাল ফেলে লবণ দিয়ে প্রতিটি আমড়া ৫ থেকে ১০ টাকা করে বিক্রি করে। আকারে বড়, পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু পিরোজপুরের আমড়া মুখোরোচক হওয়ায় বিক্রি হয় দেদারছে। ফলে আমড়া চাষীদের কম মূল্যেই দেশে-বিদেশি রপ্তানি করতে হচ্ছে।

এ এলাকার আমড়া চাষ সম্পর্কে জানা যায়, উপকূলীয় জেলাগুলোতে আশির দশকে এক শ্রেণির বেকার যুবকরা আমড়া চাষের দিকে ঝুকে পড়ে। বর্তমানে এক বস্তা আমড়ার বাজার দর রয়েছে প্রকারভেদে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। আমড়া একটি লাভজনক ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ পুষ্টিকর ফল হওয়ায় আশির দশকের পর থেকে এ গাছের রোপণ তথা চাষ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে কাউখালী, নাজিরপুর এবং স্বরূপকাঠী উপজেলাতে গড়ে উঠেছে শতাধিক আমড়ার আড়ৎ। আমড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইতোমধ্যেই  কাউখালীর এবং নেছারাবাদ মোকাম থেকে বিদেশেও রপ্তানি শুরু হয়েছে। জেলার পতিত জায়গা সরকারি খাস জমি লিজ নিয়ে, সড়ক ও জনপথের দুধারে এবং বসতবাড়িতে নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসায়ী ভিত্তিতে ব্যাপকহারে আমড়ার চাষ করা হচ্ছে।

বর্তমানে এতো বেশি আমড়ার ফলন হচ্ছে যে দেশ বিদেশে রপ্তানির পরও পর্যাপ্ত পরিমাণ আমড়া থেকে যাচ্ছে। অথচ হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। যে কারণে আড়ৎদারদের চাহিদার তুলনায় বেশি সরবরাহ হওয়ায় স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে কম মূল্য আমড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষীরা।

কাউখালী উপজেলার সাহাপুরা গ্রামের আমড়া ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, এ মোকাম থেকে বছরের চার মাস অর্থাৎ আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে কোটি টাকার আমড়া চালান দেয়া হয়। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, নারায়নগঞ্জ, যশোর, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, নোয়াখালী ছাড়াও এখন দেশের বাইরে ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়াসহ দেশ বিদেশের বহু স্থানে এ এলাকার এতিহ্যবাহী আমড়ার বেশ চাহিদা রয়েছে বলে আমড়া চাষীরা জানান। এ জেলায় আমড়া বাগানের সংখ্যা বাড়ছে এবং পল্লী গায়ের প্রতিটি বাড়িতে একটি-দুটি করে এই ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ আমড়ার চারা রোপণ করা হচ্ছে। এলাকার এমন কোনো বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে ২-৪টি আমড়া না আছে। আমড়া গাছের চাড়া রোপণের ৩-৪ বছরের মধ্যে ফলন ধরে, তা কোনো রোগ-বালাই ছাড়াই এক নাগারে ১৫-২০ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়। এর পর আস্তে আস্তে গাছ শুকিয়ে যায় ফলে জমিরও কোন ক্ষতি হয় না। এ কারণে এলাকায় আমড়া চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

নেছারাবাদ উপজেলায় বড় সাইজের অধিক আমড়া ফলনের উল্লেখযোগ্য স্থান। আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের জিন্দাকাঠি গ্রামের স্কুল শিক্ষক যিনি কয়েকটি আমড়া বাগানের মালিক কৃষ্ণকান্তি রায় বলেন, এ বছর তিনি ৬০ হাজার টাকার আমড়া বাগান বিক্রি করেছেন। তিনি আরও বলেন, একটি পরিপক্ক আমড়া গাছে কম পক্ষে ৬-৮ মণ পর্যন্ত আমড়া ধরে। পেয়ারা চাষে বছর বছর ধরে চাষীরা মার খাওয়ায় আমড়া চাষাবাদ লাভজনক হয়ে উঠছে। এজন্য মানুষ ঝুঁকছে আমড়া চাষাবাদে।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে আমড়া বাংলাদেশের একটি সু-পরিচিত ফল। এটি ছেলে-মেয়েদের অতি প্রিয়। আমড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ. বি. সি. ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। খাদ্যপোযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম আমড়ায় রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন, ১৫ গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম স্নেহ, ০.২৮ মিঃ গ্রাম ভিটামিন এ, ০.০৪ মি. গ্রাম ভিটামিন বি, ৯২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৫ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩.৯ মি. গ্রাম লৌহ এবং ৮০০ মাইক্রোগ্রম ক্যারোটিন রয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি আমড়ায় ৬৬ কি. গ্রাম খাদ্য শক্তি রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান আমাদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন। ফলে একদিকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করছে এবং অন্যদিকে বাম্পার ফলনে আর্থিক লাভবান হওয়া যায়। এবং আপদকালীন সময়ে গ্রামে-গঞ্জে যখন কৃষকদের হাতে কোনো টাকা পয়সা থাকে না তখন আমড়ার বাম্পার ফলনই আমড়া চাষীদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে।

চাষীদের দাবি সরকারি পর্যায়ে একটি হিমাগার স্থাপন করে চাষীদের আমড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর বাগানে এ বছর এই মৌসুমে ফলটির ফলন হয়েছে ৫ হাজার টন। এই আমড়া স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাগান মালিকরা প্রায় ১০ কোটি টাকা উপার্জন করবে।

জানা গেছে, কার্তিক থেকে অগ্রাহায়নের মাঝামাঝিতে গাছের চারপাশে অল্প গর্ত করে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপিও সার প্রয়োগ করতে হয়। পরে বাংলার চৈত্র মাঝামাঝি গাছে ফুল ধরে। ফুলের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ফুল থেকে ফলের গুটি বের হয়। এসময়, প্রয়োজনমতো পানি পেলে শ্রাবন মাসের মধ্যে বিক্রির জন্য ফল পরিপক্ক হয়ে ওঠে। কান্দা জমি অথবা বসতবাড়ির উচুঁ জায়গায় মাদা তৈরি করে ১৬ হাত পরপর ফাঁকা রেখে এক একটি আমড়া গাছ লাগাতে হয়।

স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অরুন রায় জানান, আমড়া একটি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ হওয়ায় এটি অল্প সময়ের মধ্যেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং ফল ধরে। পরিকল্পিতভাবে আমড়া চাষ করে প্রচুর অর্থ লাভ করা সম্ভব।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবুল হোসেন তালুকদার বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের জন্য সত্যিই এটি একটি সু-সংবাদ। তিনি বালেন লাভজনক এই মৌসুমী ফল আমড়া গাছে রোগ বালাই খুবই কম। কিছু কিছু গাছে বৈশাখের শুরুতে নতুন গজানো পাতায় লেদা পোঁকার আক্রমন হয়। কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীরা ঘুরে ঘুরে বাগানে গিয়ে চাষীদের বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ছিটানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন।


সূত্র : প্রিয়.কম