বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ || সময়- ১:২৯ am
ভেঙে ফেলা হবে শতাব্দী প্রাচীন রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার ভবন
মঙ্গলবার ১৪ নভেম্বর ২০১৭ , ৭:০৮ am
গ্রন্থাগার ভবন

প্রহরনিউজ, রাজশাহী: ১৩৩ বছর আগে,১৮৮৪ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। তারপর থেকে বহু দুষ্পাপ্য ও দুর্লভ বই ও ম্যাগাজিনে ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থাগার। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে নামি-দামি সব ব্যক্তির আগমন ঘটেছে এখানে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থাগারটি পরিণত হয়েছে রাজশাহী শহরসহ এই এলাকার সাহিত্য-সংস্কৃতির এক প্রাণকেন্দ্রে। শতবর্ষী এই গ্রন্থাগারের ভবনটি ভেঙে নতুন কমপ্লেক্স তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। স্থানীয় সচেতন সমাজ বলছে, রাসিকের দায়িত্ব ছিল ঐতিহাসিক এই স্থাপনাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।

জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারটি ভেঙে দিয়ে নতুন একটি কমপ্লেক্স নির্মাণের টেন্ডার দেয় রাসিক। এর প্রতিবাদে শহরের সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন পালন করে রাজশাহীবাসী। তারা বলেন, শতাব্দী প্রাচীন এই গ্রন্থাগারের সঙ্গে রাজশাহীর ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এটি ভেঙে ফেলা হলে সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অনেক স্মৃতিই মুছে যাবে।

রাসিকের বরেন্দ্র বাতিঘর সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৪ সালের ৯ জুলাই স্থাপিত হয় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। তবে এরও আগে, ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট বইতেও এই গ্রন্থাগারের উল্লেখ রয়েছে। পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের কাশিমপুর হাউসে ছিল এই গ্রন্থাগার। পরে মিয়াপাড়ায় ভবন ও জমি পাওয়ার পর ১৮৮৪ সালে গ্রন্থাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

হান্টারের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭১-৭২ সালে এই গ্রন্থাগারে বই ছিল ৩ হাজার ২৪৭টি, সাময়িকী ছিল ছয়টি। এসময় পাঠক ছিল নয় জন। এর মধ্যে ছয় জন ছিলেন ব্রিটিশ।

দীঘাপাতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদানাথ রায়ের দান করা জমিতে কাশিমপুরের জমিদার রায় বাহাদুর কেদার নাথ প্রসন্ন লাহিড়ী স্থাপন করেছিলেন এই গ্রন্থাগার। রাজশাহী মহানগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত বলে এটি ‘মিয়াপাড়া সাধারণ গ্রন্থাগার’ নামেও পরিচিত।

জানা যায়, রাজা আনন্দ রায়ের পরে তার ছেলে রাজা চন্দ্র রায় বছরে ২০ পাউন্ড বা ২০০ টাকা অনুদান দিতেন এই গ্রন্থাগারের জন্য। তার চার ছেলে রাজা প্রমদনাথ রায়, কুমার বসন্ত কুমার রায়, কুমার শরৎ কুমার রায় ও কুমার হেমন্ত কুমার রায় এবং মেয়ে রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা রায়ও এই গ্রন্থাগারে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিতেন। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসন, রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে নিয়মিত অনুদান পাওয়া যেত এই গ্রন্থাগারের জন্য। এখন শুধু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বছরে ৬০ হাজার টাকা অনুদান পাওয়া যায়।

শতবর্ষী এই গ্রন্থাগারের শতকরা ৫০ ভাগ বই দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ। গ্রন্থাগারের বয়স ১৩৩ বছর হলেও এখানে ২০০ বছরের পুরনো বইও আছে। স্কটল্যান্ড থেকে প্রকাশিত শেক্সপিয়ার গ্রন্থাবলীর প্রথম সংস্করণ, অ্যানুয়াল রেজিস্ট্রার, মাইকেল মধূসূদন দত্তের ‘একেই বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’র প্রথম সংস্করণ, বৃটিশ আমলের পত্রিকা ভারতবর্ষ, শনিবারের চিঠি, বসুমতি, রিভিউয়ের মতো সব বই ও পত্রিকা রয়েছে এখানে। যে কারণে বহু গবেষকই নিয়মিত এসেছেন এই গ্রন্থাগারে।

রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে যাতায়াত ছিল এমন বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, সরোজিনী নাইডু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৯২৯), ড. মো. শহীদুল্লাহ, জলধর সেন, জে জি ড্রমান্ড, স্যার আজিজুল হক, রজনীকান্ত দাস, প্রফুল্ল কুমার সরকার, গডফ্রেজ যখমন, শিশির ভাদুড়ী প্রমুখ।

স্বাধীনতার পর কবি বেগম সুফিয়া কামাল, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, লেখক আজাহার উদ্দীন, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাসাগর অধ্যাপক ড. এফ এ গুপ্ত, রামমোহন কলেজের ড. জ্যোৎস্না গুপ্ত, শিক্ষাবিদ প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কথাশিল্পী রশীদ হায়দারের মতো ব্যক্তিদের পদচারণায় মুখর ছিল এই গ্রন্থাগারটি।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ার কারণেই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সিটি করপোরেশন। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও সাধারণ গ্রন্থাগারের সভাপতি হেলাল মাহমুদ শরীফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রন্থাগার ভবনটির অবস্থা ভালো না। সেটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য অর্থায়নও পাওয়া গেছে। তবে ঐতিহাসিক মূল্যের কারণেই এই ভবনের একটি রেপ্লিকা তৈরি করা হবে, যেন পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে আগে গ্রন্থাগারটি কেমন ছিল।’

প্রায় ৪৬ বছর ধরে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কর্মরত শুকুর আহমেদ জানান, এখানে মোট ৩৬ হাজার বই রয়েছে। ভবন ভাঙার কাজ শুরু হলে নগরীর হেলেনাবাদ গালর্স হাই স্কুলের হলরুমে বইগুলো রাখা হবে।

রাজশাহী সিটি করেপারেশনের (রাসিক) মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনটি অনেক পুরনো। এটি সংস্কার করে কোনও লাভ নেই। তাই ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সেখানে থাকা দুর্লভ বইগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তর করা হবে। সেই সঙ্গে ভবনটির বর্তমান আদলের একটি রেপ্লিকা তৈরি করে মূল ফটক করা হবে।’

তবে জেলা প্রশাসন বা সিটি করপোরেশনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. চিত্তরঞ্জন মিশ্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শতাব্দী প্রাচীন এই ভবনটি রেখে জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। তারপরও যদি ১৩৩ বছরের ভবনটি ভেঙে ফেলা হলে কিছু বলার নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগীয় শহরে এই ধরনের ভবন নেহাতেই কম। এমন একটি ভবন ভবিষ্যত প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারত। এটা রাজশাহীর সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এই ভবনটি ভেঙে ফেলা হলে ঐতিহ্য আর স্মৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে। পৃথিবী কোনও দেশেই এ ধরনের নিদর্শন ভেঙে ফেলার নজির তেমন একটা নেই। তাই আমার মনে হয়, যেভাবেই হোক, ভবনটি সংরক্ষণ করা উচিত।’

রাজশাহীর প্রবীণ সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘ভবনটি ভেঙে না ফেলে সংস্কার-সংরক্ষণ করে এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আশপাশের ফাঁকা জায়গায় নতুন ভবন তৈরি করা যেতে পারে। নতুন কমপ্লেক্সের অর্থায়ন করছে ভারত। তাদেরও ভেবে দেখা দরকার ছিল, এমন একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভবনকে এভাবে ভেঙে ফেলা যায় কিনা।’

তবে শেষ পর্যন্ত ভবনটি সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে নতুন ভবন নির্মাণ করে যেন এখানকার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ বজায় রাখা হয়, সেই দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। রাজশাহী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক দিলিপ কুমার বলেন, ‘নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ভবন। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে হয়তো এ ধরনের ভবন সংস্কারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে নতুন ভবন তৈরি করে সেখানেই বইপত্র সংস্করণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক নামি-দামি ব্যক্তিত্ব এসেছেন, অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে এখানে। নতুন ভবন তৈরির সময় এ বিষয়গুলো মাথায় রাখলে হয়তো সেটা মন্দের ভালো হবে।’


সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন