বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ || সময়- ১:৩০ am
ডিসেম্বরের গণ্ডিতে আমাদের দেশপ্রেম
মঙ্গলবার ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৫:২৮ pm
ডিসেম্বরের ১৬

রাজু আহমেদ
ঢাকা:
মাক্সিম গোর্কি সৃষ্ট বিশ্ব বিখ্যাত ‘মা’ উপন্যাস ছাড়াও আমাদের আনিসুক হক লিখিত আরেকখানা ‘মা’ আছে-তা আমরা ক’জন জানি? জানি কি, আমাদের ‘মা’ উপন্যাস রচনার উপাখ্যান কী? ডিসেম্বর মাস আসতেই ফেসবুকের প্রোফাইলে পতাকাখোচিত নিজের ছবি প্রচারের মাধ্যমেই কি দেশেপ্রেমের ষোলআনা উসূল হয়ে যায়? গতানুগতিকভাবে আমি সমগ্র ডিসেম্বরকে বিজয়ের মাস বলতে রাজী নই। কেন নই-সে ব্যাখ্যায় পরে আসছি তার আগে নির্ধারণ করি, শুধু ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ পর্যন্ত স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের জাগরণ সরব রাখলেই কি দেশমাতৃকার সবটুকু ঋণ পুরণ হয়ে যাবে? অথচ আমরা এসব করছি। আমাদের দেশপ্রেম এসে ঠেকেছে ১৬ ডিসেম্বরের ছকে। বিশ্বের সব জাতির ইতিহাস অতীতের গর্ভে সৃষ্টি হয়েছে অথচ আমরা বর্তমানে বসে অতীতের ইতিহাস সৃষ্টি করি। সত্যকে মিথ্যার মোড়ক দিয়ে মীমাংসিত বিষয়ে বিতর্ক ঢালি। দূর্ভাগ্য জাতির, কতিপয় দলান্ধ জ্ঞানপাপীর কারনে এ জাতির কোন ইস্যূই আর অমীমাংসিত রয়নি। যা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে তা সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করে সংযোজন, বিয়োজন করা হয়েছে। আবার ক্ষমতার পরিবর্তন আবার সংবিধান রক্তাক্ত। এভাবেই চলছে, হয়তো চলবেও....।
একটু বলে নেই, আমি কেন গোটা ডিসেম্বরকে বিজয়ের মাস বলতে রাজি নই। স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ নয় মাসে এদেশের মুক্তিকামী মানুষের জান-মালের যতোটা ক্ষতি হয়েছে তার বৃহদাংশের ক্ষতি হয়েছে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত। বুদ্ধিজীবি হত্যার বীভৎস ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসে দূর্লভ। কাজেই পাকিস্তানের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে সে বিজয়ের সূচনা ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে আজ অবধি এবং যতদিন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রইবে ততোদিন কিন্তু কোনভাবেই ডিসেম্বরের প্রথম পক্ষকে মন থেকে বিজয়ের কাল মানতে পারবো না; বরজোড় বিজয়ের পথ উম্মুক্ত হওয়ার সন্ধিক্ষণ বলতে পারি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এ জাতি যেভাবে ইতিহাস বিকৃতির সাক্ষী হয়েছে তা বোধহয় বিশ্ব ইতিহাসে দু’টো পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতার স্থপতিকে নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী ভারত কিংবা বাংলাদেশীদের দ্বারা সার্বজনীন-সর্বকালীন ঘৃণ্য পাকিস্তানে পর্যন্ত বিতর্ক ওঠেনি অথচ আমরা বঙ্গবঙ্গুকে নিয়ে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছি। আমরা যে কতটা ছোট হতে পারি তার প্রমাণ রেখেছি। যদিও এক ব্যক্তির জন্য একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়না তারপরেও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কিংবদন্তীতুল্য। এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে ঘৃণ্য কাঁদাছোঁড়াছুড়ি হয় অথচ যাদেরকে কেন্দ্র করে আজ রাজনীতিতে ঘৃণার প্রসার ঘটানোর অপচেষ্টা হচ্ছে তারা সবধরণের সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ছিলেন।
বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের প্রকৃত ইতিহাস জানার জন্য এদেশের এবং আন্তর্জাতিক বহু লেখকের অনবদ্য সৃষ্টি আছে। এদেশের আবহমানকালের চালচিত্র, বৃটিশ-ভারতে অন্তভূর্ক্ত থাকাকালীন সময়ে এ বঙ্গের গুরুত্ব, পাকিস্তান আমলের শোষণ-পীড়ন, শেরে বাংলা-সোহরাওয়ার্দী-ভাসানী-মুজিব-জিয়ার রাজনেতিক পরিমন্ডলে উত্থাণপর্ব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গঠন, লক্ষ্য ও অবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তীকালের বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম, ভাগ্য পরিবর্তনের চিত্র এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমানের ভাবমূর্তি, গুরুত্ব জানার জন্য অসংখ্য বই এখন বাজারে আছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকৃত ইতিহাস জানার জন্য কোনভাবেই কট্টর বাম কিংবা ডানপন্থী কোন বুদ্ধিজীবির লেখা পড়ে সত্যের নাগাল পাওয়া মুসকিল হবে। রাষ্ট্রের সঠিক ইতিহাস ও ইতিবৃত্ত জানতে হলে যারা অন্তত কিছুটা নিরপেক্ষ তাদের চিন্তা পাঠ করা আবশ্যক। বাম কিংবা ডানপন্থী দলান্ধ বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমেও দেশের বাস্তব অবস্থা জানা সম্ভব বটে তবে সেক্ষেত্রে দু’দিকের চিন্তাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে অধ্যয়ণ করতে হবে এবং নিজের মধ্যে সমন্বয় করার গভীরবোধ থাকতে হবে। সত্য জানার প্রক্রিয়ায় এটা জটিল ধারা বটে। আন্থনী ম্যাসকারনেহাসের ‘দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশে’, ‘বাংলাদেশের রক্তের ঋণ’ আনিসুল হকের ‘মা’ কিংবা কতিপয় জ্ঞানপিপাসুর চিন্তা পড়লে সত্যের অনেকটা উম্মোচিত হবে বলে আশা করা যায়।
মুখে সুবচন ছড়িয়ে যদি দুর্নীতিকে আশ্রয় দেয়া হয়, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা হয় তবে সেটাকে দেশপ্রেম বলে না। সাংবিধানিক মৌলিকাধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটাই স্বদেশপ্রেমের মূর্ত বাস্তবতা। যারা রাষ্ট্রের টাকা অবৈধপথে বিদেশ চালান করছে, এদেশের শ্রমিক-মজুরের টাকু শুষে যারা বিদেশে নবাবী হালে জীবন-যাপন করছে, যাদের দ্বারা মাদক দ্রব্যের সয়লাব চারিদিকে, যারা যুব সমাজকে ধ্বংসের জন্য উম্মাদনা ছড়াচ্ছে, যারা ধর্মীয় উম্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় মত্ত তাদের থেকে স্বভূম রক্ষার আপ্রাণ প্রচেষ্টাই নিঁখাদ দেশপ্রেম। কেবল ডিসেম্বর এলো বলে লাল-সবুজের পতাকা-ব্যানার হাতে, শাড়ী-কাপড় অঙ্গে চেপে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানোর নাম দেশপ্রেম নয়। যারা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দলীয়স্বার্থ এবং দলীয়স্বার্থের চেয়ে জাতীয়স্বার্থকে অগ্রগণ্য রাখে তাদেরকে জাতির দায়িত্বশীল নির্ধারণ করা পর্যন্ত যে সংগ্রামের পথ সেটা পাড়ি দেয়ার জন্য অবিশ্রাম থাকাটাই দেশপ্রেম। জনবান্ধব কোন সরকারকে যদি কোন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিপদে ফেলার কিংবা উচ্ছেদ করার চক্রান্ত ফাঁদে তবে তা রুখে দাঁড়ানোর সৎসাহস-ই দেশপ্রেম। স্বজনপ্রীতিহীন-দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ বাংলাদেশ বিনির্মানে যারা কাজ করে যাচ্ছে তাদের সহায়তায় নিজেকে দাঁড় করানো এবং দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখার যে চেতনা সেটাই স্বাধীনতার চেতনা এবং এ চেতনাবোধ থেকেই দেশপ্রেমের জন্ম। দলান্ধ হয়ে যারা সত্যকে মাড়িয়ে যায় তাদের অন্ধ অনুকরণ করা সুনাগরিকের ধর্ম নয়। এ ভূমি আমাদের মাতৃভূমি, আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। শুধু মুখের মিষ্টি কথায় নয় বরং অন্তরের বিশ্বাসের দ্বারাই দেশ প্রেমের কাজে নিয়োজিত হওয়া আমাদের পূর্বসূরীদের দর্শনের সাথে একাত্ম হওয়ার পথ। যারা বুকের তাজা খুনের বিনিময়ে, শুণ্য হাতে মেশিনগানের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্থান বিশ্ব মানচিত্রে স্থায়ী করে গেলেন সে বাংলাদেশকে সোনার বাংলাদেশে পরিণত করা প্রত্যেক নাগরিকের অনিবার্য দায়িত্ব।
আমাদের স্বাধীনতার বয়স প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে চলল। দীর্ঘ এ পথ চলায় আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান একেবারে নাতিদীর্ঘ নহে। তবে আমরা যা অর্জন করেছি, তা আমাদের জন্য অঙ্কিত স্বপ্নের চেয়ে অনেক কম। নানা প্রতিকূলতা কিংবা সদিচ্ছার অভাবে হয়ত আমাদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির মিলন ঘটানো যায়নি। দেশের সামনে এখনও অপার সম্ভাবনা অবশিষ্ট আছে। কেবল রাজনৈতিক সহনশীলতা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং পারস্পারিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে আমাদের দেশ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছবে বলে আশা রাখি। ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত লিপ্সা ত্যাগ এবং গণতন্ত্রের সুষ্ঠূ বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশেকে এশিয়ার টাইগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। দেশের সামনে যে সকল সম্ভাবনা রয়েছে তার প্রত্যেকটির যদি সুষ্ঠু বাস্তবায়ণ করা সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশকে সোনার দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক হবে এমন সাধ্য কার? এজন্য প্রয়োজন একদল সত্যিকারের দেশপ্রেমী সৃষ্টি, যারা রাষ্ট্র স্বার্থের জন্য উৎসর্গিত হবে। সকল সংকীর্ণতা ও ভেদাভেদ ভুলে যারা দেশের সেবায় নিয়োজিত রবে। আমাদের দেশেপ্রেম যদি আবেগের খোলস মুক্ত হয়ে বাস্তবিকতার প্রয়োজনে দন্ডায়মান হয় তবে অসাধ্য বলে কোন শব্দ আর দামালের অভিধানে থাকবে না।
এজন্য বেশি বেশি অধ্যয়ণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতির সাথে হৃদ্যতার বন্ধন তৈরি করতে হবে। সকল কলুষতার উর্ধ্বে এসে রাষ্ট্রের স্বার্থকে স্থান দিতে হবে। ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, মীমাংসিত ইস্যুতে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে যুব সমাজকে বিব্রত করার মাধ্যমে যদি সত্যকে আড়াল করা হয় তবে সেটা রাষ্ট্রের আগামীর জন্য আত্মঘাতী হবে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও যদি মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে টালবাহানা চলে, প্রাতিষ্ঠানগুলোকে চরম দলীয়করণ করার হীন মানসিকতা দেখানো হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বাত্রে দুর্নীতি বাসা বাঁধে তবে রাষ্ট্র জীর্ণতা মুক্ত হয়ে সম্মৃদ্ধির পথে আগাতে পারবে না মোটে। প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে যে জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত চলছে সে জাতিকে নিয়ে খুব বেশি স্বপ্ন সাজাবার সুযোগ থাকবে না যদি আশু উদ্যোগে শিক্ষাখাতকে রাহুগ্রাসমুক্ত করা না হয়। দুর্নীতির কারনে যদি রাষ্ট্র মেধাবীদের সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় তাহলেও আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাস্তবায় দুর্গম হবে। যদি কোন একই লেখার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করলে সেটা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তবে আমরা আগাবো যতোটুকু তারচেয়ে বোধহয় পেছাতে হবে আরও বহুগুন বেশি। দোষারোপের রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে না পারলে, জনতার ভাষা উপেক্ষিত হলে রাষ্ট্রকে বার বার স্বপ্ন ভঙ্গের ঢেউয়ে পেন্ডুলামের ভূমিকা বরণ করতে হবে।

 

লেখক: কলামিষ্ট
rajucolumnist@gmail.com